চ্যানেল এস: কমিউনিটিকে এক সুতোয় বেঁধে রাখার গল্প
প্রকাশিত হয়েছে : ২১ ডিসেম্বর ২০২৫
মোহাম্মদ আতিকুর রহমান
আজ থেকে ২১ বছর আগে এক তরুণ একটি স্বপ্ন দেখেছিলেন—ব্রিটেনে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশি কমিউনিটিকে একটি প্ল্যাটফর্মে আনা, তাদের পক্ষে কথা বলার একটি শক্ত ও নির্ভরযোগ্য কণ্ঠ তৈরি করা। সেই স্বপ্ন আর সাহসী সিদ্ধান্ত থেকেই জন্ম নেয় চ্যানেল এস। সময় আজ প্রমাণ করেছে, সেই উদ্যোগ কোনো আবেগী কল্পনা ছিল না; ছিল একটি দূরদর্শী পরিকল্পনা।
যিনি সেই স্বপ্ন দেখেছিলেন, তিনি আর কেউ নন—ব্রিটেনে বাংলাদেশি কমিউনিটির পক্ষে যার কণ্ঠ সবার আগে শোনা যায়, যিনি সংকটে মানুষের পাশে দাঁড়ান আগেভাগেই, যাঁর হাত ধরে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হয় আরও দৃঢ় ও স্পষ্ট—তিনি মাহী ফেরদৌস জলিল। তাঁর সাহসী পদক্ষেপ ও দৃঢ় মানসিকতার কারণেই চ্যানেল এস আজ অন্যদের থেকে যোজন যোজন এগিয়ে।
প্রবাসে বসবাস করা একটি কমিউনিটির জন্য দায়িত্বশীল গণমাধ্যম কতটা জরুরি, তা না দেখলে বোঝা যায় না। ব্রিটেনে বাংলাদেশি কমিউনিটি সেই অভিজ্ঞতা পেয়েছে চ্যানেল এস-এর মাধ্যমে। ২১ বছর ধরে এই চ্যানেল শুধু সম্প্রচার করেনি, কমিউনিটির পাশে দাঁড়িয়ে দায়িত্ব পালন করে গেছে—নীরবে, ধারাবাহিকভাবে, অবস্থান নিয়ে।
আমি বিষয়টা শুধু দর্শক হিসেবে দেখিনি। চ্যানেল এস-এ বার্মিংহাম প্রতিনিধি হিসেবে যুক্ত হওয়ার পর বিভিন্ন সময় বেশ কিছু আলোচিত নিউজ করেছি। তখন খুব কাছ থেকে দেখেছি—একটি নিউজ প্রচারের পর কী ধরনের প্রতিক্রিয়া আসে, কীভাবে চাপ তৈরি হয়, আর সেই চাপ চ্যানেল এস-এর অফিস ও নিউজ টিম কীভাবে দৃঢ় হাতে সামলায়। তখনই বুঝেছি, এই চ্যানেলের শক্তি কোথায়।
চ্যানেল এস-এ কোনো একটি বিষয়ে নিউজ হওয়া মানেই বিষয়টা শুধু স্ক্রিনে সীমাবদ্ধ থাকে না। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের টনক নড়ে। কারণ এখানে খবর থেমে থাকে না শিরোনামে। ঢুকে পড়ে গভীরে। প্রশ্ন তোলে, জবাব চায়। কমিউনিটির স্বার্থের প্রশ্নে চ্যানেল এস কখনো নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে কথা বলেনি।
শুধু অনুষ্ঠান দিয়েই চ্যানেল এস কমিউনিটির মন কেড়েছে—তা কিন্তু নয়। সত্যটা হলো, চ্যানেল এস-এর প্রাণভোমরা হচ্ছে এর নিউজ। প্রতিদিন রাত ১০টায় প্রচারিত এই সংবাদ পুরো যুক্তরাজ্য ছাড়াও ইউরোপ, আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বাংলাদেশিরা নিয়ম করে দেখতেন। এটা কৌতূহল নয়, এটা অভ্যাসও নয়—এটা ছিল নির্ভরতার জায়গা। মানুষ জানত, এখানে খবর মানে সাজানো গল্প নয়; এখানে থাকে খোঁজ নেওয়া সত্য।
বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ তুলে আনতে চ্যানেল এস-এর সাংবাদিকরা থাকেন সদা জাগ্রত। মাঠে, ফোনে, নথিতে—সবখানেই তাঁদের উপস্থিতি। সহজ রাস্তা ছেড়ে কঠিন প্রশ্ন বেছে নেওয়ার সাহসটাই এই নিউজ টিমের শক্তি। এ কারণেই ব্রিটেনের বাংলাদেশি কমিউনিটিতে চ্যানেল এস-এর নিউজকে অনেকেই বিবিসির নিউজের সঙ্গে তুলনা করেন। এই তুলনা হাওয়ায় ভেসে আসেনি। খবরের ধার, গভীরতা আর গ্রহণযোগ্যতায় চ্যানেল এস নিজেই সেই মানদণ্ড তৈরি করেছে।
তবে গত কয়েক মাস ধরে কারিগরি কিছু সমস্যার কারণে রাত ১০টার নিয়মিত সংবাদ আর প্রতিদিন প্রচারিত হচ্ছে না। এখন সপ্তাহে মাত্র দুই দিন নিউজ দেখানো হয়। এ নিয়ে কমিউনিটিতে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, উদ্বেগও আছে। মানুষ আবার আগের মতো প্রতিদিনের নিউজ ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায় আছে। কারণ যে নিউজ কমিউনিটিকে কানেক্ট করে, সেই নিউজ মানুষ প্রতিদিনই স্ক্রিনে দেখতে চান।
অপরদিকে ‘রিয়েলিটি উইথ মাহী’ শুধু একটি টক শো নয়। এটি মূলত মাহী ফেরদৌস জলিলের অবস্থানের প্রকাশ। তিনি উপস্থাপক হিসেবে কথা বলেন না, কথা বলেন একজন দায়িত্বশীল কণ্ঠ হিসেবে। সংকটের সময় পুরো কমিউনিটি অপেক্ষা করে—মাহী ফেরদৌস জলিল কী বলবেন, কীভাবে বিষয়টা দেখবেন। কারণ তাঁর কথার ভেতর থাকে অভিজ্ঞতা, স্পষ্টতা আর কমিউনিটির প্রতি দায়। এই কারণেই তাঁর বলা একটি বাক্য অনেক সময় দীর্ঘ আলোচনার জন্ম দেয়।
চ্যানেল এস-এর এই দীর্ঘ পথচলার পেছনে রয়েছে একটি শক্ত নেতৃত্ব ও সুসংগঠিত টিম। যেখানে নির্ভরতার প্রতীক হয়ে এর ফাউন্ডার মাহী ফেরদৌস জলিল লিড দিয়ে যাচ্ছেন। এর পাশাপাশি চ্যানেল এস-এর আরেক দৃঢ় নির্ভরতা হচ্ছেন চ্যানেল এস-এর চেয়ারম্যান আহমেদ উস সামাদ চৌধুরী। ম্যানেজিং ডিরেক্টর তাজ চৌধুরী এবং ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল হক দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে যাচ্ছেন পুরো টিমকে উদ্বুদ্ধ করতে।
এছাড়া হেড অব প্রোগ্রাম হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন ফারহান মাসুদ খান। প্রোডিউসার হিসেবে আব্দুল আহাদ, হেড অব নিউজ মিল্টন রহমান এবং নিউজ এডিটর রুপি আমিন—এই টিমটাই চ্যানেল এস-এর কনটেন্ট ও নিউজকে একটি সুসংগঠিত কাঠামোর মধ্যে ধরে রেখেছেন । এই সমন্বয়ই চ্যানেল এস-কে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।
দেশ আর প্রবাসের মাঝে যে সেতুটা দরকার, চ্যানেল এস সেই সেতু তৈরি করেছে কাজ দিয়ে। তাই ১৬ ডিসেম্বর এলেই ওয়ালথামস্টো অফিসে মানুষের ভিড় দেখা যায়। ফুল আসে, শুভেচ্ছা আসে, ভালোবাসা আসে। এসব আনুষ্ঠানিকতা নয়—এগুলো কৃতজ্ঞতার প্রকাশ।
এই ২১ বছরে চ্যানেল এস অনেককে প্ল্যাটফর্ম দিয়েছে, অনেক সত্য সামনে এনেছে, অনেক অস্বস্তিকর প্রশ্ন তুলেছে। ব্রিটেনে বাংলাদেশি কমিউনিটির পক্ষে এক শক্তিশালী ভয়েস হয়ে জন্মলগ্ন থেকেই কাজ করে যাচ্ছে চ্যানেল এস।
কমিউনিটির বিশ্বাস, কারিগরি সমস্যাগুলো দ্রুত কাটিয়ে খুব শিগগিরই চ্যানেল এস আবার নিয়মিত রাত ১০টার সংবাদ নিয়ে ফিরবে। কারণ কমিউনিটির সঙ্গে কানেক্ট থাকা যে নিউজ, তা থেমে থাকতে পারে না।
আমার চোখে চ্যানেল এস কোনো প্রতিষ্ঠান নয়—এটা একটি অবস্থান। কমিউনিটির পক্ষে দাঁড়ানোর অবস্থান। আর এই অবস্থান ধরে রাখাই ২১ বছরের সবচেয়ে বড় সাফল্য।
মোহাম্মদ আতিকুর রহমান : সাংবাদিক, লেখক । বার্মিংহ্যাম প্রতিনিধি, চ্যানেল এস।

