১ কোটি ৬৫ লাখ কৃষক পাবেন কার্ড, থাকবে ১০ ধরনের সুবিধা
প্রকাশিত হয়েছে : ২২ মার্চ ২০২৬
দেশ ডেস্ক:: কৃষি খাতে সরকারি ভর্তুকি, ঋণ ও প্রণোদনা কৃষকের কাছে সহজলভ্য করতে সরকার কৃষকদের জন্য কৃষক কার্ড চালু করতে যাচ্ছে। আগামী চার বছরে ১ কোটি ৬৫ লাখ কৃষকের হাতে এই কার্ড বিতরণ করা হবে।
মৎস্যচাষি ও দুগ্ধখামারিরাও এ সুবিধার আওতায় থাকবেন। সরকারের লক্ষ্য, কৃষকদের কাঠামোগত বঞ্চনা কমানো।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, কৃষক কার্ডের আওতায় একজন কৃষক প্রাথমিকভাবে ১০ ধরনের সুবিধা পাবেন।
এর মধ্যে রয়েছে ন্যায্যমূল্যে কৃষি উপকরণ, সরকারি ভর্তুকি ও প্রণোদনা, ন্যায্যমূল্যে সেচসুবিধা, সহজ শর্তে কৃষিঋণ, কৃষি বিমা, ন্যায্যমূল্যে কৃষিপণ্য বিক্রয়, কৃষিবিষয়ক প্রশিক্ষণ, আবহাওয়ার তথ্য এবং রোগবালাই দমনে পরামর্শ।
এ কার্ডের আওতায় জমির পরিমাণ অনুযায়ী কৃষক সার কিনতে পারবেন, যা অতিরিক্ত সারের ব্যবহার কমাতে সাহায্য করবে।
কৃষকের অন্যান্য ভাতা বা প্রণোদনার কোনো কার্ড থাকলে তা নতুন কার্ডের আওতায় চলে আসবে।
তবে সুবিধাগুলো কীভাবে বিতরণ করা হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। কয়েকটি উপজেলায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার মন্তব্য
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানিয়েছেন, এ উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য কৃষককে স্বীকৃতি দেওয়া ও মর্যাদা নিশ্চিত করা। প্রতিটি কৃষকের জন্য সোনালী ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খোলা হবে।
প্রথম ধাপে ২১ হাজার ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষককে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। তিনি বলেন, ৫ শতাংশের কম জমির মালিক হলে ভূমিহীন, ৫ থেকে ৪৯ শতাংশ জমির মালিক হলে প্রান্তিক, এবং ৫০ থেকে ২৪৯ শতাংশ জমির মালিক হলে ক্ষুদ্র কৃষক হিসেবে চিহ্নিত করা হবে।
কার্ডে কৃষকের ৪৫ ধরনের তথ্য থাকবে। আর্থিক প্রণোদনার টাকা কৃষিতে ব্যয় হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করা হবে।
পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও তথ্য সংগ্রহ
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশের ১০টি উপজেলার ১০টি কৃষি ব্লকে পরীক্ষামূলকভাবে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের কাজ চলছে। এপ্রিলের মধ্যে উপাত্ত সংগ্রহ শেষ হবে।
এরপর ১৫টি উপজেলার সব কৃষককে নিয়ে কৃষক কার্ড বিষয়ক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে।
তবে বর্তমানে কৃষকের আয়, জমির মালিকানা ও আর্থিক অবস্থা বিবেচনায় ক্ষুদ্র, ভূমিহীন, প্রান্তিক, মাঝারি ও সচ্ছল—এই পাঁচ শ্রেণিতে কৃষকদের অন্তর্ভুক্ত করার কাজও চলমান আছে।
সুবিধাগুলো কী কী
কৃষি প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু জানিয়েছেন, সরকারি প্রণোদনা, ভাতা ও ভর্তুকি সহজলভ্য করতে কার্ড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। কৃষিসংস্কৃতির সঙ্গে মিলিয়ে আগামী পয়লা বৈশাখ (১৪ এপ্রিল) কৃষক কার্ডের উদ্বোধন করা হবে।
বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে কৃষক কার্ডের প্রতিশ্রুতি অন্তর্ভুক্ত ছিল। কৃষি খাতে মৌলিক রূপান্তরের অংশ হিসেবে এ কার্ড চালুর অঙ্গীকার করেছে সরকার।
নির্বাচনি ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়েছিল, কৃষি খাত পিছিয়ে থাকার কারণ স্বল্পদৃষ্টিসম্পন্ন নীতি, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি এবং আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সীমিত ব্যবহার।
নির্বাচনি অঙ্গীকার হিসেবে এরই মধ্যে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করা হয়েছে। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রিসভার বৈঠকে শস্য, ফসল, পশুপালন ও মৎস্য খাতে ঋণ মওকুফ করা হয়েছে। মওকুফ করা ঋণের পরিমাণ ১ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা, যা কমপক্ষে ১২ লাখ কৃষককে উপকৃত করবে।
সরকারের লক্ষ্য
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, দেশে মোট কৃষক পরিবারের সংখ্যা ১ কোটি ৬৫ লাখ। প্রাথমিকভাবে কৃষক কার্ডের ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ বছরে ৬৮১ কোটি টাকা। তবে সবকিছু চূড়ান্ত হওয়ার পর ব্যয় কম-বেশি হতে পারে।
কৃষক কার্ডের মাধ্যমে সরকার লক্ষ্য করছে, কৃষি ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন, কৃষকের আয় বৃদ্ধি, প্রধান খাদ্যশস্যের উৎপাদন বৃদ্ধি, কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনে বৈচিত্র্য, চাষাবাদের খরচ কমানো, কৃষিপণ্যের বিপণন প্রক্রিয়া উন্নত করা এবং সব ধরনের ভর্তুকি বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।
ভালো উদ্যোগ, তবে চ্যালেঞ্জও আছে
সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সেলিম রায়হান বলেন, কৃষক কার্ড বিতরণ গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হলেও বাস্তবায়নের পথে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
প্রথমত, প্রকৃত কৃষক সঠিকভাবে শনাক্ত করা বড় সমস্যা হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে তালিকা হালনাগাদ না থাকায় অ-কৃষক বা মধ্যস্বত্বভোগীরা সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা করতে পারে।
দ্বিতীয়ত, ন্যায্যমূল্যে সার ও ডিজেল বিতরণে বাজারে কৃত্রিম সংকট, দুর্নীতি বা অনিয়ম দেখা দিতে পারে। স্থানীয় পর্যায়ে তদারকির অভাব থাকলে প্রকৃত কৃষক বঞ্চিত হতে পারেন।
তৃতীয়ত, প্রযুক্তিগত অবকাঠামো, তথ্য ব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন দপ্তরের সমন্বয় ঠিক না হলে উদ্যোগের কার্যকারিতা কমে যেতে পারে।
সেলিম রায়হান সরকারের জন্য পরামর্শ দিয়েছেন, কৃষকদের জন্য নির্ভুল ও ডিজিটাল ডেটাবেজ তৈরি করা, ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে স্বচ্ছ যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া চালু করা এবং সার-ডিজেল ও অন্যান্য ভর্তুকি বিতরণে কঠোর তদারকি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা। সূত্র: প্রথম আলো

