জনপ্রিয় ফুটবলার থেকে টিটন হয়ে উঠেন শীর্ষ সন্ত্রাসী
প্রকাশিত হয়েছে : ২৯ এপ্রিল ২০২৬
দেশ ডেস্ক:: রাজধানীতে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটনের মরদেহ তার যশোরের বাড়িতে পৌঁছেছে। বুধবার রাত ৮টার দিকে শহরের খড়কি আপন মোড়ের বাড়িতে মরদেহ পৌঁছালে স্বজনরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। রাতেই জানাজা শেষে শহরের কারবালা কবরস্থানে তার মরদেহ দাফন করা হয়।
নিহত টিটন যশোর শহরের খড়কি আপনমোড় এলাকার বাসিন্দা জুটমিল কর্মকর্তা কে এম ফকরউদ্দিনের ছেলে। ১১ ভাইবোনের মধ্যে চতুর্থ টিটন জামিনে হাজারীবাগের সুলতানগঞ্জে বসবাস করতেন। গত মঙ্গলবার রাত ৮টার দিকে নিউমার্কেটের পশ্চিম পাশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহনেওয়াজ ছাত্রাবাসের সামনে বটতলায় টিটনকে গুলি করে হত্যা করে মোটরসাইকেল আরোহী দুই মুখোশধারী। এ ঘটনায় বুধবার মামলা করেছেন তার বড় ভাই খন্দকার সাঈদ আক্তার রিপন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একসময়ে জনপ্রিয় ফুটবলার ছিলেন খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন। ১৯৮৬-৮৭ সালের দিকে যশোরের ওস্তাদখ্যাত কোচ ইমদাদুল হক সাচ্চুর তত্ত্বাবধানে জেলায় যে কয়েকজন ফুটবলার প্রতিনিধিত্ব করতেন টিটন তাদের একজন। আক্রমণাত্মক খেলোয়াড় নৈপুণ্যতা থাকায় চুয়াডাঙ্গা, খুলনা, ঢাকাতেও বিভিন্ন দলের হয়ে খেলতেন। খেলোয়াড় জীবনের জনপ্রিয়ের তুঙ্গে থাকাকালীন জড়িয়ে পড়েন রাজনীতিতে। পদ পদবীতে না থাকলেও বিএনপির স্থানীয় কর্মী ছিলেন টিটন। ৯৮ সালের দিকে যশোরের পানি উন্নয়ন বোর্ডের সামনে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে প্রতিপক্ষরা তাকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে জখম করে। কয়েকমাস জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকার পরে সুস্থ হয়ে জড়িয়ে পড়েন অপরাধ জগতে। ১৯৯৯ সালে যশোরের কারবালায় জোড়া খুনের পর যশোর ছেড়ে ঢাকায় চলে যান। পরে ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডে ভয়ংকর হয়ে ওঠেন। ধীরে ধীরে অপরাধজগতে নিজের পরিচিতি বাড়াতে থাকেন। তিনি একাধিক হত্যাকাণ্ডে নেতৃত্বও দেন। অস্ত্র সোনাচালান ব্যবসার সঙ্গেও জড়িত ছিলেন। তার নেতৃত্বে অস্ত্রের একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে। তার বিরুদ্ধে একাধিক হত্যা মামলা ছিল, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ব্যবসায়ী বাবর এলাহী হত্যা।
২০০৪ সালে টিটনকে ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করেছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তিনি ২০১৪ সালে বাবর এলাহী হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হন। ২০২৪ সালের ১২ আগস্ট জামিনে মুক্তির পর তিনি আত্মগোপনে ছিলেন বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি সূত্র জানিয়েছে।
অপর একটি সূত্র জানায়, খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকার ২০০১ সালের ২৩ জন শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকা প্রকাশ করে, সেখানে টিটনের নাম ছিল ২ নম্বরে। সেই সময় সরকারের পক্ষ থেকে এই শীর্ষ ২৩ সন্ত্রাসীকে ধরিয়ে দিতে পুরস্কার ঘোষণা করে দেশজুড়ে পোস্টার সাঁটা হয়। টিটনের ভগ্নিপতি ছিলেন ঢাকার আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজেদুল ইসলাম ইমন, যার ছত্রছায়ায় টিটন ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন। টিটনের নাম মোহাম্মদপুরের সন্ত্রাসী চক্র হারিছ-জোসেফ গ্রুপে যুক্ত ছিলেন। টিটনের তৎপরতা ছিল ধানমণ্ডি ও হাজারীবাগ এলাকায়।
বুধবার রাতে যখন টিটনের মরদেহ খড়কির আপনমোড়ে পৌঁছায়, তখন প্রতিবেশী ও খেলোয়াড়রা তার বাড়িতে ছুটে আসেন।
যশোরের সাবেক খেলোয়াড় ও রেফারি লাবু জোয়াদ্দার জানান, ‘টিটনের বাবার দুটি স্ত্রী ছিলেন। দুই মায়ের ১২ সন্তানের মধ্যে টিটন প্রথম মায়ের সন্তান। ৯০ দশকের দিকে নাইমুর হাসান টিটন ও তার বড় ভাই রিপন দুজনেই যশোরের সেরা ফুটবলার ছিলেন। সাচ্চু ওস্তাদের নেতৃত্বে আমরা যারা ৯০ দশকে এই অঞ্চলে ফুটবলের নেতৃত্ব দিতাম; তাদের মধ্যে টিটন একজন। দুঃখজনক ঘটনা হলো নামকরা ফুটবলার থেকে সে অন্ধকার জগতে প্রবেশ করে। তার এই জগতে প্রবেশও ট্র্যাজেডি রয়েছে। তার ওপর রাজনীতিক হামলা হওয়াতে প্রতিশোধপরায়ণ হয়েই সে ওই জগতে পা বাড়ান। ৯৯ সালের দিকে ঢাকাতে যেয়ে সন্ত্রাসীদের সঙ্গে জড়িয়ে পড়লে সে আর যশোরে আসেন না।’
স্থানীয়রা জানান, দীর্ঘদিন যশোরে না থাকায় এই প্রজন্মের অনেকেই টিটনকে চিনেন না। তবে রাজনীতিক পটপরিবর্তনের পর তিন থেকে চারবার যশোরের বাড়িতে আসেন। যদিও সে অবিবাহিত। বাড়িতে এসেও কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতেন না। পরিবারের স্বজনরা টিটনের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি গণমাধ্যমের কাছে।
দীর্ঘ কয়েক দশকের অপরাধ অধ্যায়ের পর অবশেষে গুলিতেই এই শীর্ষ সন্ত্রাসীর জীবনের সমাপ্তি ঘটলো। এদিকে, এই ঘটনার বুধবার সকালে ঢাকার নিউমার্কেট এলাকায় মামলা করেন বড়ভাই খন্দকার সাঈদ আক্তার রিপন। এ মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় ৮-৯ জনকে আসামি করা হয়েছে। টিটনকে হত্যার ঘটনায় করা মামলার এজাহারে বলা হয়, বসিলা পশুরহাটের ইজারা সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরেই এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে বলে পরিবারের ধারণা। দীর্ঘসময় কারাভোগের পর গত বছরের ১২ আগস্ট টিটন জামিনে মুক্তি পান। এরপর মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে তিনি পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে অতীতে পরিবারের সম্মানহানি ও আর্থিক ক্ষতির জন্য দুঃখপ্রকাশ করেন এবং সৎ পথে জীবন গড়ার ইচ্ছা পোষণ করেন।
কয়েকদিন আগে টিটন তার ভাইকে জানিয়েছিলেন, তিনি হাটের ইজারাসংক্রান্ত কাগজপত্র (শিডিউল) কিনেছেন এবং ব্যবসা করতে চান। ২৬ এপ্রিল টিটন তার ভাইকে জানান, বসিলা পশুর হাটের ইজারা নিয়ে পিচ্চি হেলাল, বাদল, শাহজাহান ও রনির সঙ্গে তার বিরোধ চলছে। পরদিন ২৭ এপ্রিল জানান, বিরোধ মিটিয়ে একসঙ্গে কাজ করার জন্য তাকে একটি মিটিংয়ে ডাকা হয়েছে। এরপরেই গতকাল রাত ১১টার দিকে পরিবারের সদস্যরা জানতে পারেন, নিউমার্কেটের শাহনেওয়াজ হলের সামনে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় টিটনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। বুধবার বিকেলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গ থেকে ছোট ভাইয়ের লাশ বুঝে নেন রিপন।
নিউমার্কেট থানার ওসি মোহাম্মদ আইয়ুব জানান, টিটন হত্যার ঘটনায় তার বড় ভাই খন্দকার সাঈদ আক্তার রিপন বুধবার সকালে অজ্ঞাতনামা ৮-৯ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেছেন। এই ঘটনায় পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে।
আর যশোর কোতয়ালী মডেল থানার ওসি মো. মাসুম খান জানান, ‘টিটনের বিরুদ্ধে মামলা থাকতে পারে। মামলার আপডেট জানা নাই।’



