রামিসা হত্যাকাণ্ড : প্রধান আসামি সোহেল ও তার স্ত্রীর বিচার শুরু
প্রকাশিত হয়েছে : ০১ জুন ২০২৬
দেশ ডেস্ক:: রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যা মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানা (৩১) ও তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুন (২৬)-এর বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করে বিচার শুরুর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। গতকাল ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। একইসঙ্গে মামলার সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য মঙ্গলবার দিন ধার্য করেন ট্রাইব্যুনাল।
আদালতের বেঞ্চ সহকারী পঙ্কজ পিটার গোমেজ জানান, অভিযোগ পড়ে শোনানোর পর দুই আসামিই নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন। আদালত অভিযোগ গঠন করে সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য মঙ্গলবার দিন ধার্য করেন। মামলার প্রথম সাক্ষী হিসেবে আদালতে সাক্ষ্য দেবেন ভুক্তভোগী শিশুর বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা।
এদিকে আদালতে নেয়ার পথে সাংবাদিকদের কাছে অভিযুক্ত সোহেল রানা দাবি করেন, আমি একা দোষী না। আমি শুধু বাচ্চারে (রামিসা) দুই টুকরো করেছি। ধর্ষণ করছে ডলার, মারছে ডলার। এ সময় তিনি তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুনকে নির্দোষ দাবি করে বলেন, আমার বউয়ের কোনো দোষ নাই। তবে, মামলার চার্জশিট ও স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতেও ‘ডলার’ নামে কোনো ব্যক্তির নাম পাওয়া যায়নি।
এর আগে, সকাল সাড়ে ৭টার দিকে সোহেলকে কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে আর স্বপ্নাকে কাশিমপুর কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়। শুনানিকালে তাদের এজলাসে তোলা হয়।
দুই পক্ষের আইনজীবী যা বলেন: রাষ্ট্রপক্ষে মামলা পরিচালনায় আইনজীবী হিসেবে নিযুক্ত বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আজিজুর রহমান দুলু অভিযোগ গঠনের পক্ষে শুনানি করে বলেন, শিশু রামিসা আক্তারকে বাসায় ডেকে নিয়ে বাথরুমে জোরপূর্বক ধর্ষণ করা হয়। তাকে বেঁধে নির্যাতনের একপর্যায়ে রামিসা অজ্ঞান হয়ে পড়ে। পরে আসামি তাকে মৃত ভেবে লাশ গুম করার উদ্দেশ্যে শরীর থেকে গলা কেটে আলাদা করে। একইসঙ্গে বাথরুমের ভেতরেই তার হাত-পা বিচ্ছিন্ন করা হয়। শুনানিতে তিনি আরও বলেন, ‘ঘটনার দিন ভুক্তভোগীর মা রামিসাকে স্কুলে পাঠানোর জন্য ডাকাডাকি করলে তাকে খুঁজে পাননি। পরে একটি জুতা দেখতে পেয়ে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। এ সময় আশপাশের লোকজন জড়ো হন। ভবনের অন্যান্য ফ্ল্যাটের দরজা খুললেও আসামিদের ফ্ল্যাটের দরজা না খোলায় সবার মধ্যে সন্দেহ সৃষ্টি হয়। পরে জানালা দিয়ে একজন ফ্ল্যাটের ভেতরে রক্ত দেখতে পান। এরপর দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করলে দেখা যায়, আসামি সোহেল রানা পালিয়ে গেছে। তার স্ত্রী তখন উপস্থিত লোকজনকে জানান, তার স্বামী এমন ঘটনা ঘটিয়ে পালিয়ে গেছে।
এরপর আসামিপক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মুসা কালিমুল্যাহ আসামিদের অব্যাহতি চেয়ে শুনানি করেন। শুনানিতে তিনি বলেন, তড়িঘড়ি করে মামলার তদন্ত শেষ করা হয়েছে। এ ছাড়া পুলিশ কোনো প্রত্যক্ষদর্শীও উপস্থাপন করতে পারেনি। মেডিকেল রিপোর্টে ধর্ষণেরও প্রমাণ মিলেনি বলে তিনি জানান।
উভয়পক্ষের শুনানি নিয়ে বিচারক সোহেলের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ পড়ে শোনান। পরে অপর আসামি স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগও পড়ে শোনানো হয়। এরপর বিচারক স্বপ্না আক্তারকে নিজেকে দোষী মনে করেন কিনা জানতে চাইলে তিনি হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন। তিনি তার স্বামী সোহেল রানাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘তুমি বলো আমি দোষী কিনা। এ সময় সোহেল রানা আদালতে স্বপ্নাকে নির্দোষ দাবি করেন। শুনানি শেষে আদালত দুই আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে আজ মঙ্গলবার সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য করেন।
শুনানি শেষে রাষ্ট্রপক্ষে মামলা পরিচালনায় আইনজীবী হিসেবে নিযুক্ত বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আজিজুর রহমান দুলু বলেন, পুলিশের দেয়া প্রতিবেদনে ডলার নামে কেউ নেই। আসামি যদি এমন কিছু দাবি করে থাকে সেটা সাক্ষ্যপ্রমাণে উঠে আসতে পারে। এটা ম্যাটার অব ট্রায়াল। তিনি জানান, দ্রুত সময়ে এ মামলা নিষ্পত্তি হবে। আসামিদের সর্বোচ্চ সাজা হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
আমি শুধু লাশ কেটেছি: কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে সোহেল উপস্থিত আইনজীবীদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আমি ধর্ষণ করি নাই, শুধু লাশ কেটেছি। ধর্ষণ করেছে ডলার নামে একজন। আমি পাপ করেছি, আমাকে সেই পাপের শাস্তি দেন। মেয়েটাকে এনে দিতে পারলে ডলার তাকে দুই লাখ টাকা দেয়ার কথা বলে। এরপর পুলিশ সদস্যরা তাকে থামিয়ে দেন।
‘মিরপুর-১১ নম্বর লাইনে বাড়ি ডলারের। রামিসাকে ধর্ষণ-হত্যার মূল আসামি ওই ডলার। ধর্ষণও ডলার করছে, মারছেও ডলার। ওরে ধরেন, আপনারা (সাংবাদিকরা) সব পাবেন। সোহেল আরও বলেন, ‘আমার স্ত্রী আমাকে সাহায্য করেনি। আমার ওয়াইফের কোনো দোষ নাই। দোষ ডলারের আছে। আমার দোষ আছে, ডলারেও দোষ আছে। আমি অত অপরাধী না। আমি শুধু বাচ্চারে দুই টুকরো করেছি। ধর্ষণ করছে ডলার, মারছে ডলার। আমার কোনো ডিএনএ টেস্ট নেয়নি। অটোমেটিক নিয়ে নিছে। ডলার আমাকে দুই লাখ টাকা দিছে। ডলার অনেক ধনী লোক, টাকাওয়ালা। এরপর কাঠগড়ায় একে অপরের সঙ্গে কথা বলেন সোহেল ও স্বপ্না।
এ সময় স্বপ্নাকে সোহেল জানায় চিন্তা না করতে। তার (স্বপ্না) কোনো দোষ নেই বলে জবানবন্দি দিয়েছেন বলেও জানান সোহেল। এরপর বেলা ১১টা ৩৮ মিনিটে স্বপ্নাকে কাঠগড়া থেকে পুলিশি নিরাপত্তায় হাজতখানায় নেয়া হয়। এ সময় স্বামী সোহেল রানার দিকে তাকিয়ে থাকেন স্বপ্না। সোহেলও তাকে অভয় দিয়ে বলেন চিন্তা না করতে। এরপর পুলিশ সদস্যরা তাকে থামিয়ে দেন। পরে বেলা ১১টা ৪৯ মিনিটে আসামি সোহেলকে কাঠগড়া থেকে নামিয়ে প্রিজন ভ্যানে নেয়া হয়।


