ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যের ৯০ বছর: পূর্ব লন্ডনে স্মরণ করা হলো ঐতিহাসিক ‘ব্যাটল অব ক্যাবল স্ট্রিট’
প্রকাশিত হয়েছে : ০৫ অক্টোবর ২০২৬
লন্ডন, ৫ অক্টোবর ২০২৬:: ফ্যাসিবাদ ও বর্ণবাদের বিরুদ্ধে পূর্ব লন্ডনের সাধারণ মানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের ঐতিহাসিক ঘটনা ‘ব্যাটল অব ক্যাবল স্ট্রিট’-এর ৯০তম বার্ষিকী পালিত হয়েছে নানা আয়োজনে। রোববার ৪ অক্টোবর টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিল, ক্যাবল স্ট্রিট নাইনটি (সিএস৯০) অর্গেনাইজিং কমিটি, বিভিন্ন ট্রেড ইউনিয়ন ও কমিউনিটি সংগঠন এবং শত শত মানুষের অংশগ্রহণে স্মরণসভা, পদযাত্রা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
১৯৩৬ সালের ৪ অক্টোবর ফ্যাসিস্ট নেতা স্যার অসওয়াল্ড মসলের নেতৃত্বে ব্রিটিশ ইউনিয়ন অব ফ্যাসিস্টদের পরিকল্পিত মিছিল প্রতিহত করতে স্টেপনি ও পূর্ব লন্ডনের হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছিলেন। শ্রমিক, ইহুদি, আইরিশ, বাঙালিসহ বিভিন্ন কমিউনিটি ও ট্রেড ইউনিয়নের মানুষ একজোট হয়ে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। ইতিহাসে এই ঘটনা ‘ব্যাটল অব ক্যাবল স্ট্রিট’ নামে পরিচিত। ঐতিহাসিক এই প্রতিরোধ আজও ঐক্য, সংহতি ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত।
নব্বইতম বার্ষিকী উপলক্ষে রোববার দুপুর ১২টায় হোয়াইটচ্যাপেল রোডস্থ টাওয়ার হ্যামলেটস টাউন হলের সামনে সমবেত হন অংশগ্রহণকারীরা। দুপুর ১টায় সেখান থেকে ঐতিহাসিক কেবল স্ট্রিটের উদ্দেশ্যে পদযাত্রা শুরু হয়। পরে সেন্ট জর্জেস গার্ডেনসে দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয় মূল স্মরণসমাবেশ।
পদযাত্রায় অংশ নেন টাওয়ার হ্যামলেটসের নির্বাহী মেয়র লুৎফুর রহমান, জেরিমি করবিন এমপিসহ স্থানীয় কমিউনিটি ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, ট্রেড ইউনিয়ন প্রতিনিধি, ইতিহাসবিদ এবং বিভিন্ন প্রজন্মের বাসিন্দারা।
সেন্ট জর্জেস গার্ডেনসের সমাবেশে বক্তৃতা, সংগীত, কবিতা আবৃত্তি ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মাধ্যমে ঐতিহাসিক প্রতিরোধের স্মৃতি তুলে ধরা হয়। বক্তারা বলেন, “৯০ বছর আগের সেই ঐক্যের শিক্ষা আজও প্রাসঙ্গিক। ঘৃণা, বর্ণবাদ, ফ্যাসিবাদ ও বিভাজনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন কমিউনিটির মানুষকে ঐক্যবদ্ধভাবে অবস্থান নিতে হবে।”
টাওয়ার হ্যামলেটসের নির্বাহী মেয়র লুৎফুর রহমান বলেন, “কেবল স্ট্রিট আমাদের যৌথ ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি মনে করিয়ে দেয়, ভিন্ন ভিন্ন কমিউনিটির মানুষ যখন ঘৃণা ও বিভাজনের বিরুদ্ধে একত্রিত হন, তখন তাঁরা কতটা শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারেন। ৯০ বছর পরও সেদিনের সাহসী মানুষদের স্মরণ করা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাঁদের অবস্থান থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি।”
তিনি আরও বলেন, “বিভিন্ন পটভূমির মানুষের অবদানে গড়ে উঠেছে আজকের টাওয়ার হ্যামলেটস। বিভিন্ন কমিউনিটির মানুষের সহাবস্থান ও পারস্পরিক সম্প্রীতি বরোর অন্যতম শক্তি। সর্বশেষ রেসিডেন্ট সার্ভের ফলাফলের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বরোর ৯১ শতাংশ বাসিন্দা মনে করেন, বিভিন্ন পটভূমির মানুষ তাঁদের স্থানীয় এলাকায় ভালোভাবে একসঙ্গে বসবাস করছেন।”
অনুষ্ঠানে বিভিন্ন কমিউনিটির প্রতিনিধিরাও তাঁদের বক্তব্যে ক্যাবল স্ট্রিটের ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরেন। ইহুদি কমিউনিটির পক্ষ থেকে রাব্বি হার্শেল গ্লুক ক্যাবল স্ট্রিটের ঐতিহাসিক তাৎপর্য তুলে ধরেন। ৪ অক্টোবর ইহুদি ধর্মীয় পবিত্র দিবস হওয়ায় তিনি এবং তাঁর কমিউনিটির অনেকে সরাসরি অনুষ্ঠানে অংশ নিতে পারেননি। তবে তিনি আয়োজনের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানান।
সিন্টি-রোমা হলোকাস্ট স্মরণ দিবসের গুরুত্ব তুলে ধরেন ড্যানিয়েলা আব্রাহাম। স্বাধীণতা ট্রাস্টের জুলি বেগম বাঙালি কমিউনিটির কাছে কেবল স্ট্রিটের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, “এই ঐতিহাসিক ঘটনা পূর্ব লন্ডনের বাঙালিসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ঐক্য ও সম্মিলিত প্রতিরোধের ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।”
এ ছাড়া ঐতিহাসিক কেবল স্ট্রিটের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থান ও পদযাত্রার পথের ইতিহাস ব্যাখ্যা করেন ইতিহাসবিদ ডেভিড রোজেনবার্গ।
অনুষ্ঠানে ক্যাবল স্ট্রিট নাইনটি (সিএস৯০) অর্গেনাইজিং কমিটি-এর পক্ষ থেকে অ্যালেক্স গর্ডন, মেরি ডেভিস ও ডেভিড রোজেনবার্গ প্রতিনিধিত্ব করেন। জন সভায় স্বাগত বক্তব্য দেন টাওয়ার হ্যামলেটস নির্বাহী মেয়র লুৎফুর রহমান।
‘ব্যাটল অব ক্যাবল স্ট্রিট’ এর নব্বইতম বার্ষিকী উদযাপনের অংশ হিসেবে টাওয়ার হ্যামলেটসে দুটি বিশেষ প্রদর্শনীরও আয়োজন করা হয়েছে।

‘দ্য ব্যাটল অব ক্যাবল স্ট্রিট’ প্রদর্শনী
টাওয়ার হ্যামলেটস লোকাল হিস্টোরি লাইব্রেরি অ্যান্ড আর্কাইভসে আয়োজিত এই প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে ঐতিহাসিক ঘটনার দুর্লভ আলোকচিত্র, সংবাদপত্রের প্রতিবেদন, পোস্টার, পুস্তিকা ও বিভিন্ন সংরক্ষিত নথি। এতে ১৯৩৬ সালের ৪ অক্টোবরের ঘটনাপ্রবাহ, পূর্ব লন্ডনে ফ্যাসিবাদের উত্থান এবং তার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের প্রতিরোধের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে।
প্রদর্শনীটি ১ অক্টোবর থেকে ২৭৭ ব্যাংক্রফট রোড, লন্ডন E1 4DQ-তে শুরু হয়েছে এবং পুরো অক্টোবর মাসজুড়ে দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে।
‘এ বরো বিল্ট বাই নিউকামার্স’ প্রদর্শনী
টাওয়ার হ্যামলেটস টাউন হলে আয়োজিত দ্বিতীয় প্রদর্শনীতে বরোর দীর্ঘ অভিবাসন ও কমিউনিটি গঠনের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। হুগেনট শরণার্থী, ইহুদি অভিবাসী এবং বাঙালি কমিউনিটিসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর আগমন, বসতি স্থাপন এবং বরোর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশে তাঁদের অবদান প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে।
প্রদর্শনীটি ১ অক্টোবর থেকে টাওয়ার হ্যামলেটস টাউন হল, ৬০ হোয়াইটচ্যাপেল রোড, লন্ডন E1 1BJ-তে দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে।
এদিকে ঘৃণা, বিদ্বেষ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা বাড়াতে কাউন্সিলের ‘নো প্লেস ফর হেট’ প্রচারণায় অংশ নেওয়ার জন্য স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
নব্বই বছর আগে কেবল স্ট্রিটে বিভিন্ন কমিউনিটির মানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ শুধু একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়, বরং ফ্যাসিবাদ, বর্ণবাদ ও বিভাজনের বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে দাঁড়ানোর এক অনন্য দৃষ্টান্ত। ৯০ বছর পূর্তির এই আয়োজন সেই ঐতিহাসিক বার্তাকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি বৈচিত্র্য, সম্প্রীতি ও সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রতি টাওয়ার হ্যামলেটসের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে।
ক্যাবল স্ট্রিট পদযাত্রা ও স্মরণ অনুষ্ঠান আয়োজনে সহযোগিতাকারী সংগঠনগুলোর মধ্যে রয়েছে: আলতাব আলী ফাউন্ডেশন, ইতালির জাতীয় পার্টিজান সমিতি – এএনপিআই, বাংলাদেশি ওয়ার্কার্স কাউন্সিল, কেব্ল স্ট্রিট গ্রুপ, ক্যারিবিয়ান লেবার সলিডারিটি, কমিউনিস্ট পার্টি অব ব্রিটেন – সিপিবি, ডেডালাস থিয়েটার কোম্পানি, ডকল্যান্ডস থিয়েটার, ইসলিংটন ট্রেডস কাউন্সিল, ইহুদি ব্লক, ইহুদি সমাজতান্ত্রিক গ্রুপ, ফায়ার ব্রিগেডস ইউনিয়ন (এফবিইউ), জিএফটিইউ, জিএমবি, গ্রেটার লন্ডন অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রেডস কাউন্সিলস, মার্ক্স মেমোরিয়াল লাইব্রেরি ও ওয়ার্কার্স স্কুল, মডার্ন ককনি ফেস্টিভাল, দ্য মর্নিং স্টার, ন্যাশনাল এডুকেশন ইউনিয়ন (এনইউ), নিউহ্যাম ট্রেডস কাউন্সিল, নিজর মানুষ, আরএমটি, সার্চলাইট, রোমানি হলোকাস্ট মেমোরিয়াল ট্রাস্ট – সিন্তি, স্ট্যান্ড আপ টু রেসিজম, স্টপ দ্য ওয়ার কোয়ালিশন, স্বাধীনতা ট্রাস্ট, টুগেদার অ্যালায়েন্স, টাওয়ার হ্যামলেটস ট্রেডস কাউন্সিল, টিএসএসএ, টিইউসি – লন্ডন, ইস্টার্ন ও সাউথ ইস্ট, ইউনিসন লন্ডন রিজিয়ন, ইউনাইট কমিউনিটি – টাওয়ার হ্যামলেটস, ইউনাইট ফর আ ওয়ার্কার্স ইকোনমি, ইউনাইট দ্য ইউনিয়ন, ওয়াটফোর্ড ট্রেডস কাউন্সিল, ইয়ং কমিউনিস্ট লীগ (ওয়াইসিএল)।


