বৃটিশ পার্লামেন্টে কেন সিলেটি ভাষায় বিতর্ক করেছিলেন আপসানা
প্রকাশিত হয়েছে : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
দেশ রিপোর্ট, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ : পূর্ব লন্ডনের পপলার অ্যান্ড লাইম হাউস আসনের এমপি আপসানা বেগম বৃটেনের পার্লামেন্টে প্রথমবারের মতো সিলেটি ভাষায় বিতর্ক করেছিলেন। কেন সিলেটি ভাষা বিতর্ক করেছিলেন এবং কীভাবে সেটা সম্ভব হয়েছিলো এ নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন।
সম্প্রতি লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাবের একটি প্রতিনিধিদল তাঁর আমন্ত্রণে বৃটিশ পার্লামেন্টের কার্যক্রম দেখতে গেলে এসময় বিভিন্ন অলাইন টিভির সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ ব্যাপারে বিস্তারিত কথা বলেন। আপসানা বেগম বলেন, ২০১৯ সালে যখন নির্বাচিত হয়ে প্রথম পার্লামেন্টে আসি, তখন আমি খুব সচেতন ছিলাম যে আমি কোন এলাকা থেকে নির্বাচিত হয়ে এসেছি।পপলার অ্যান্ড লাইম হাউসে অবশ্যই অনেক বড় একটি ব্রিটিশ বাংলাদেশি কমিউনিটি রয়েছে । আমি তাঁদের প্রতিনিধিত্ব করছি । তবে এখানে ৯০টিরও বেশি ভাষায় মানুষ কথা বলেন।
আমি যখন ছোট ছিলাম, তখন সাপলিমেন্টারি ক্লাস ও কমিউনিটি ল্যাংগুয়েজ সার্ভিস-এর ক্লাসে অংশ নিতাম। সেখানেই আমি বাংলা শেখার সুযোগ পেয়েছি। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি বাংলা ভাষাকে আরও বেশি উপলব্ধি করতে শুরু করি । আমি বুঝতে পারি-এটাই আমার শিকড়।
আমি বাংলাদেশে খুব বেশি যাইনি । কিন্তু তারপরও আমি জানি-আমার পরিবার সেখান থেকে এসেছে, আমার বাবা-মা সেখান থেকে এসেছেন, আমার শিকড় সেখানে। আমার মনে হয়, ব্রিটিশ বাংলাদেশি তরুণরা বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই বিষয়গুলো আরও বেশি উপলব্ধি করতে পারে। আমি সব সময় ভাষা নিয়ে খুবই আগ্রহী ছিলাম। কমিউনিটি ল্যাংগুয়েজ সার্ভিসের বাজেট কাটছাঁটের বিরুদ্ধেও আমি প্রচারণার সঙ্গে যুক্ত ছিলাম।
এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর আমার মনে হলো-যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস নিয়ে কেন কোনোদিন বিতর্ক হয়নি? অথচ বাংলাদেশের উদ্যোগের কারণেই ১৯৯৯ সালে ইনিস্কো আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসকে স্বীকৃতি দেয় এবং পরবর্তীতে জাতিসংঘের মাধ্যমে এটি আন্তর্জাতিকভাবে পালিত হতে থাকে। তাহলে এমন একটি আন্তর্জাতিক দিবস যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টে কেন স্বীকৃতি পাবে না-এই প্রশ্ন আমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিলো।
তখন আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, ব্যালটের মাধ্যমে পার্লামেন্টে আবেদন করব । আমি আবেদন করি এবং সৌভাগ্যবশত সেটি সফল হয় । এরপর আমার কাছে স্বাভাবিকভাবেই মনে হলো-আমি বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত । আমি আমার মাতৃভাষাকে এখানে তুলে ধরতে চাই এবং এর প্রতিনিধিত্ব করতে চাই।
তবে পার্লামেন্টের কিছু নিয়ম-কানুন আছে। সাধারণভাবে ইচ্ছা করলেই অন্য ভাষায় পুরো বক্তব্য দেওয়া যায় না।
তাই আমি আমার ভাষায় যে কথাটি বলতে চেয়েছি, সেটি বলেছি এবং এরপর ইংরেজিতেও তার অর্থ বলেছি।
অতিরিক্ত সতর্কতার জন্য আমরা স্পীকার অফিসকেও আগে জানিয়ে দিয়েছিলাম যে আমি আমার মাতৃভাষা ব্যবহার করব । কারণ পার্লামেন্টের বক্তব্য রেকর্ড করা হয় । তারা যেন বুঝতে পারে কীভাবে সেটি রেকর্ড ও অনুবাদ করতে হবে । এটা আমার জন্য খুবই বিশেষ একটি মুহূর্ত ছিল । কারণ এতে ব্রিটেন ও বাংলাদেশের মধ্যকার সম্পর্কও ফুটে উঠেছে । আর অবশ্যই আমার মাতৃভাষা সিলেটি, বাংলা নয়। বিশেষ করে টাওয়ার হ্যামলেটসের সিলেটি কমিউনিটি এবং যুক্তরাজ্যে আমাদের নিজস্ব ইতিহাসের কারণে আমি সেটা করেছি । এটা করতে পেরে আমার খুব ভালো লেগেছে।
বাংলাদেশি হিসেবে আমরা আমাদের সংস্কৃতি ও পরিচয় উদ্যাপনের জন্য আরও অনেক কিছু করতে চাই। আর আমাদের সংস্কৃতি ও পরিচয়কে বোঝার অন্যতম প্রধান মাধ্যম হচ্ছে আমাদের ভাষা।
আফসানা বেগম আরো বলেন, পার্লামেন্টের বিভিন্ন নিয়ম-কানুন আছে। চাইলেই সবকিছু করা যায় না। আমাকে অনেক সময় বলা হয়েছে-পার্লামেন্টে এটা করা যায় না, ওটা করা যায় না; এখানে বিভিন্ন পদ্ধতি রয়েছে।
কিন্তু সত্য হলো, সঠিক কাজ করা এবং সত্যের পক্ষে কথা বলার ইচ্ছা থাকতে পারে। মানুষ আমাকে পার্লামেন্টে পাঠিয়েছে একটি দায়িত্ব পালনের জন্য। আমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হচ্ছে আমার নির্বাচনী এলাকার মানুষের প্রতি। তারাই আমাকে নির্বাচিত করে পার্লামেন্টে পাঠিয়েছেন। তাই আশা করি, আমরা ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালীভাবে আমাদের কথা তুলে ধরতে পারব।
উল্লেখ্য, লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাবের সভাপতি ব্যারিস্টার তারেক চৌধুরী, জেনারেল সেক্রেটারি আকরামুল হোসাইন ও ট্রেজারার আব্দুল হান্নান-এর নেতৃত্বে প্রতিনিধিদল আপসানা বেগম এমপির আমন্ত্রণে বৃটিশ পার্লামেন্ট পরিদর্শন করেন।


