হান্নান মাসউদের বিরুদ্ধে ‘কোটি টাকা ডিলের’ অভিযোগ তোলা ছাত্রদল নেতার বাড়িতে হামলা
প্রকাশিত হয়েছে : ০৫ জুন ২০২৬
দেশ ডেস্ক:: নোয়াখালীর সাবেক সংসদ সদস্য ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক একরামুল করিম চৌধুরীকে বাঁচাতে তিন কোটি টাকা দাবি করেন বলে এনসিপি নেতা ও এমপি আবদুল হান্নান মাসউদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। এ তথ্য ফাঁস করায় হাতিয়া উপজেলায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদলের এক নেতার গ্রামের বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর চালিয়েছে এনসিপির নেতাকর্মীরা।
গত বৃহস্পতিবার রাতে উপজেলার বুড়িরচর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম বড় দেইল গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। ঘটনার পরপরই হাতিয়া উপজেলা ছাত্রদল স্থানীয় সাগরিয়া বাজারে এ হামলা-ভাঙচুরের প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল করে। হামলার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে তারা।
ভুক্তভোগী আব্দুল গাফফার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য এবং পশ্চিম বড় দেইল গ্রামের মাওলানা মোছলেহ উদ্দিনের ছেলে। তিনি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় হান্নান মাসউদের ঘনিষ্ঠ সহচর ছিলেন।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক ও নোয়াখালী-৬ (হাতিয়া) আসনের সংসদ সদস্য আবদুল হান্নান মাসউদ আওয়ামী লীগের এক নেতাকে বিমানবন্দর পর্যন্ত পৌঁছে দিতে তিন কোটি টাকা দাবির তথ্য ফাঁস করেন আব্দুল গাফফার। এ ঘটনার জেরে ছাত্রদল নেতার বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর চালান এনসিপির নেতাকর্মীরা।
শুক্রবার আব্দুল গাফফার সাংবাদিকদের বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় এনসিপি নেতা হান্নান, রিফাত ও মাহিম নিরাপদ স্থানে ছিলেন। তখন আমিই হান্নান মাসউদকে রক্ষা করেছি। তখন তাঁদের ভিডিও থেকে সব কাজ আমি করে দিতাম। হাতিয়ার রাজনীতিতে তাঁকে আমিই প্রতিষ্ঠিত করছি। তাঁর কারণে হান্নানের সঙ্গে আমার ভালো সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তাঁর পলিটিক্যাল গার্ডিয়ান হিসেবে ৫ আগস্টের পর দেড় মাস আমি তাঁর সঙ্গে ছিলাম; যার কারণে তাঁর অনেক কিছু আমি জানি। ৫ আগস্টের পর তিনি নোয়াখালী-৪ (সদর-সুবর্ণচর) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ একরামুল করিম চৌধুরীকে বিমানবন্দরে পৌঁছে দিতে পরিকল্পনা করেন। এ জন্য তিন কোটি টাকা দাবি করেন। তখন এতে আমি বাধা দিই।’
ছাত্রদল নেতা বলেন, ‘হান্নানের তিন কোটি টাকা দাবির এ ঘটনা গত বুধবার গণঅধিকার পরিষদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান বিএনপি নেতা মুহাম্মদ রাশেদ খানকে জানাই। পরে এ নিয়ে তিনিও সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন। পরে আমি রাশেদ খানের ফেসবুক স্ট্যাটাসটি আমার ফেসবুক ওয়ালে শেয়ার করি। এ ঘটনার পর থেকে হান্নান মাসউদ আমার ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। এরপর থেকে তাঁর অনুসারীরা আমাকে ফেসবুকে নানা রকম হুমকি ও গালাগাল দিতে থাকে। একপর্যায়ে হান্নান মাসউদকে তাঁর অনুসারী কর্তৃক আমাকে হুমকি দেওয়ার বিষয়টি জানাই। তিনি বলেন, তাঁর সব লোক নিয়ন্ত্রণে নেই, তারা কথা শোনে না, যা করার করুক।’
তিনি অভিযোগ করে আরও বলেন, ‘সাবেক এমপি একরামুল করিম চৌধুরীকে বিমানবন্দর পর্যন্ত পৌঁছে দিতে তিন কোটি টাকা দাবির তথ্য ফাঁসের জেরে হান্নানের যোগসাজশে তাঁর অনুসারীরা আমার বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর চালায়। ওই সময় হামলাকারীরা আমাদের ভবনের একটি জানালা ভাঙচুর করে, প্রধান ফটকে হামলা করে। পরবর্তী সময়ে আমাকে অকথ্য ভাষায় গালমন্দ করে চলে যায়। আমার বৃদ্ধ মা ও বাবা একাই বাড়িতে থাকেন। তাঁরা এখনও ভয়ে আছেন। মা-বাবা বলছেন, আমি যেন আর কোনো বক্তব্য না দিই। আবারও তাঁরা বাড়িতে হামলার আশঙ্কা করছেন।’
হাতিয়া উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক রিয়াজ মাহমুদ বলেন, ‘আওয়ামী লীগ নেতাকে বিমানবন্দর পর্যন্ত পৌঁছে দিতে তিন কোটি টাকা দাবির বক্তব্য দেওয়ায় গত দুদিন ধরে ছাত্রদল নেতা গাফফারকে প্রকাশ্যে হান্নান মাসউদের অনুসারী এনসিপি নেতাকর্মীরা হুমকি-ধমকি দেয়। যারা হুমকি দিয়েছে, তারাই এ ঘটনা ঘটিয়েছে।’
হাতিয়া উপজেলা এনসিপির আহ্বায়ক সামছুল কিবরিয়া বলেন, ‘ছাত্রদল নেতা গাফফার দৃঢ়ভাবে বলছে, এটা এনসিপির নেতাকর্মীরা করেছে। তাহলে আমরা ধরে নেব, তারা নিজেরাই ভাইরাল হওয়ার জন্য এ ঘটনা ঘটিয়েছে। এমপি আবদুল হান্নান মাসউদ মোবাইল ফোনে আমাকে বিষয়টি অবহিত করলে আমি বৃহস্পতিবার রাতেই ঘটনাস্থলে যাই। সেখানে বিএনপির নেতাকর্মীরা একটি অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সংসদ সদস্য আবদুল হান্নান মাসউদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমার নিজের বাড়িতে হামলা হয়, আমি সেগুলো ‘ট্যাকেল’ দিয়ে উঠতে পারি না, আমি আরেকজনের বাড়িতে কখন হামলা করব? পুরোপুরি একটা সাজানো নাটক করা হয়েছে। চেষ্টা করে যাক, দেখা যাক কী করতে পারে।’
আওয়ামী লীগ নেতাকে বিমানবন্দরে পৌঁছে দিতে টাকা দাবির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ নেতাকে বিমানবন্দরে পৌঁছে দিতে তাঁর সঙ্গে কোনো চুক্তি হয়নি। কোনো টাকাও দাবি করিনি। একটি পক্ষ আমাকে সামাজিকভাবে হেয় করার জন্য এবং রাজনৈতিকভাবে চাপে রাখতেই এ ধরনের নাটক সাজিয়ে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করছে।’
এ বিষয়ে হাতিয়া থানার ওসি কবির হোসেন বলেন, ‘আব্দুল গাফফারের গ্রামের বাড়িতে একতলা ভবন। ওই ভবনের দক্ষিণ পাশে অন্ধকার। ওই দিক থেকে কেউ একজন ঢিল মারছে। ইটের টুকরো এসে পড়লে জানালার অংশবিশেষ ভেঙে যায়। কে মারছে কাউকে দেখা যায়নি। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। এ ঘটনায় এখনও কেউ কোনো লিখিত অভিযোগ করেনি। লিখিত অভিযোগ পেলে পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’


