যুক্তরাজ্যে ইসরায়েলের অস্ত্র কারখানায় হামলা ভাংচুর : চার প্যালেস্টাইন অ্যাকশনকর্মীর কারাদণ্ড
প্রকাশিত হয়েছে : ১৭ জুন ২০২৬
এই সাজা প্রতিবাদের অধিকারের ওপর বিপজ্জনক আঘাত’ : গ্রীন পার্টি লীডার

দেশ রিপোর্ট । ১৭ জুন ২০২৬ : যুক্তরাজ্যে ইসরায়েলে অস্ত্র সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানে হামলা ও ব্যাপক ভাঙচুরের ঘটনায় প্যালেস্টাইন অ্যাকশনের চার কর্মীকে কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত । ১২ জুন উলিচ ক্রাউন কোর্টে এই রায় ঘোষণা করা হয়।
দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিরা হলেন শার্লট হেড (৩০), স্যামুয়েল কর্নার (২৩), লিওনা কামিও (৩০) এবং ফাতেমা রাজওয়ানি (২১) । ২০২৪ সালের আগস্টে ব্রিস্টলের কাছে অবস্থিত এলবিট সিস্টেমসের কারখানায় প্রবেশ করে তারা প্রায় ১২ লাখ পাউন্ডের (১.২ মিলিয়ন) ক্ষয়ক্ষতি সাধন করেন বলে আদালতে প্রমাণিত হয়।
আদালত স্যামুয়েল কর্নারকে অপরাধমূলক ক্ষতিসাধন এবং এক পুলিশ সার্জেন্টকে গুরুতর শারীরিক আঘাত করার দায়ে ৭ বছর ৮ মাসের কারাদণ্ড দেন। বিচারপতি মি. জাস্টিস জনসন বলেন, স্যামুয়েল যে “চরম ও অযৌক্তিক বলপ্রয়োগ” করেছেন তার কোনো ন্যায্যতা নেই।
শার্লট হেড, যিনি একটি ভ্যান চালিয়ে কারখানা প্রাঙ্গণে প্রবেশ করেছিলেন, তাকে ৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই মেয়াদের সাজা পেয়েছেন লিওনা কামিও। ফাতেমা রাজওয়ানিকে দেওয়া হয়েছে ৪ বছর ৮ মাসের কারাদণ্ড।
বিচারক জানান, অপরাধ সংঘটনের ধরন ও উদ্দেশ্যের কারণে এ মামলাটি সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হিসেবে বিবেচিত হয়েছে । ধারণা করা হচ্ছে, যুক্তরাজ্যে প্রথমবারের মতো অপরাধমূলক ক্ষতিসাধনের একটি মামলায় সন্ত্রাসবাদের সংযোগ স্বীকৃত হলো।
আদালতের মতে, অভিযুক্তদের কর্মকাণ্ড সরকারের ওপর প্রভাব বিস্তার এবং একটি রাজনৈতিক-আদর্শিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের লক্ষ্যে পরিচালিত হয়েছিল।
মামলায় উঠে আসে যে, অভিযানের সময় স্যামুয়েল একটি স্লেজহ্যামার দিয়ে আঘাত করে পুলিশ সার্জেন্ট কেট ইভান্সের মেরুদণ্ডে গুরুতর আঘাত করেন।
আদালতে দেওয়া বক্তব্যে সার্জেন্ট ইভান্স বলেন, ঘটনার পর থেকে তিনি চিকিৎসাধীন রয়েছেন এবং শারীরিক ও মানসিকভাবে দীর্ঘমেয়াদি ভোগান্তির শিকার হয়েছেন।
তিনি বলেন, “এই ঘটনার মানসিক প্রভাব গভীর এবং এখনো চলমান। আমি প্রায়ই আতঙ্কিত অবস্থায় ঘুম থেকে জেগে উঠি কিংবা দুঃস্বপ্ন দেখি।”
ইভান্স আরও অভিযোগ করেন, আঘাত করার পর স্যামুয়েলের মধ্যে কোনো অনুশোচনার লক্ষণ দেখা যায়নি । বরং তিনি নিজের কর্মকাণ্ডকে ন্যায়সঙ্গত প্রমাণের চেষ্টা করেছিলেন।
বিচারপতি জনসন বলেন, অভিযুক্তদের মধ্যে দুজন হামলার ঘটনা সরাসরি সম্প্রচার (লাইভস্ট্রিম) করেন এবং পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও প্রকাশ করেন । এর মাধ্যমে তারা “অপরাধ ও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতাকে মহিমান্বিত” করার চেষ্টা করেছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
গ্রীন পার্টির অন্যতম শীর্ষ নেতা জ্যাক পোলানস্কি রায়ের প্রতিক্রিয়ায় বলেন, “ইসরায়েলে অস্ত্র সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সরাসরি কর্মসূচি নেওয়ার কারণে চার তরুণকে কারাগারে পাঠানো অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। তিনি এ সাজাকে প্রতিবাদের অধিকারের ওপর বিপজ্জনক আঘাত বলে উল্লেখ করেন। অন্যদিকে লেবার নেতা জন ম্যাকডোনাল্ড বলেন, শাস্তির মাত্রা অত্যন্ত বিস্ময়কর।
আসামী পক্ষের আইনজীবী রাজীব মেনন কেসি আদালতে যুক্তি দেন যে, মামলাটিকে সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে যুক্ত করা বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং এটি ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদী প্রবণতার প্রতিফলন।
তিনি আরো বলেন, অভিযুক্তরা বিশ্বাস করতেন যে তারা যে যন্ত্রপাতি ধ্বংস করছেন সেগুলো ইসরায়েলে পাঠানো হতে পারে এবং পরে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হতে পারে।
বিক্ষোভ ও গ্রেপ্তার : রায় ঘোষণার দিন আদালতের বাইরে প্রায় ৫০০ সমর্থক প্যালেস্টাইন অ্যাকশনের পক্ষে বিক্ষোভে অংশ নেন । মেট পুলিশ জানায়, বিক্ষোভ চলাকালে ১০৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে । পরে পুলিশ এলাকা ত্যাগের নির্দেশ দিলেও কয়েকশ বিক্ষোভকারী সেখানে অবস্থান করেন । কেউ কেউ সাজাপ্রাপ্তদের বহনকারী বলে ধারণা করা একটি প্রিজন ভ্যানের সামনে শুয়ে পড়ে যানবাহনের গতি রোধের চেষ্টা করেন।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের জুলাইয়ে যুক্তরাজ্য সরকার ‘প্যালেস্টাইন একশন’কে একটি নিষিদ্ধ (প্রেস্ক্রাইবড) সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করে । যদিও ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে হাইকোর্ট ওই সিদ্ধান্তকে বেআইনি বলে রায় দেয়, তবুও সংগঠনটি এখনো নিষিদ্ধ তালিকায় রয়েছে ।

