দুই মন্ত্রী বরাবরে খোলা চিঠি, অপেক্ষায় সিলেটবাসী
প্রকাশিত হয়েছে : ২৪ জুন ২০২৬

প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী আব্দুল মোক্তাদির ও সিলেটের সদ্য বিদায়ী জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম।
তাইসির মাহমুদ
ডিসি সারওয়ার আলম বিদায় নিয়েছেন । তিনি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে উপসচিব পদে যোগ দিয়েছেন । চাকরিতে তাঁর পদোন্নতি হয়েছে। অনেকেই বলছেন, ডিসির কপাল পুড়েছে। কিন্তু কোথায়? তাঁর হাত, পা, কপাল—সবই তো আগের মতোই আছে। তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ শরীরে বিমানে করে ঢাকায় চলে গেছেন।
হোক না বদলি। তাতে কী হয়েছে? তিনি তাঁর দায়িত্ব পালন করে গেছেন। জনগণকে সবকিছু দেখিয়ে দিয়েছেন। তাঁর আর সিলেটে ফিরে আসার প্রয়োজন নেই। দেশে-বিদেশে আন্দোলন-সংগ্রাম যতই হোক না কেন, পরিস্থিতি পরিবর্তনের সম্ভাবনা আপাতত খুবই ক্ষীণ।
এখন সিলেটবাসীকে যা ভাবতে হবে, তা হলো—মাজারের ব্যাপারে তিনি যে সিদ্ধান্তগুলো গ্রহণ করেছেন, সেগুলো আগামী দিনগুলোতেও স্থায়ীভাবে বহাল থাকবে কি না।
প্রতি মাসে কিংবা প্রতি সপ্তাহে প্রকাশ্যে দানবাক্স ও ডেগের টাকা গণনা করতে হবে । সমস্ত অর্থ ব্যাংকে জমা রাখতে হবে। নগদ টাকার পাশাপাশি গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি, লাউ, কদুসহ যা কিছু মাজারে দান হিসেবে আসে, সেগুলো নিলামে বিক্রি করে তার অর্থ মাজারের ব্যাংক হিসাবে জমা করতে হবে।
সরকার একজন সিইও বা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নিয়োগ করবে। তিনি পূর্ণকালীন দায়িত্ব পালন করবেন। তাঁর অধীনে বিভিন্ন স্তরে পর্যাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ করা হবে। একটি আধুনিক, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক কাঠামোর মাধ্যমে পুরো দরগাহ পরিচালিত হবে।
মাজারের অর্থ দিয়ে মাজারের উন্নয়ন করা হবে । পুরো মাজার এলাকায় উন্নতমানের টাইলস বসানো হবে। একটি আধুনিক ও দৃষ্টিনন্দন মসজিদ নির্মাণ করা হবে। নারীদের জন্য কমপক্ষে ছয়তলা একটি পৃথক ভবন নির্মাণ করা হবে। সেখানে নামাজের সুব্যবস্থার পাশাপাশি নারী উন্নয়নমূলক বিভিন্ন প্রকল্প পরিচালিত হবে। নারী শিক্ষা একাডেমি থাকবে। প্রতিটি তলায় থাকবে উন্নতমানের টয়লেট ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সুবিধা।
দরগাহ প্রাঙ্গণে একটি নির্দিষ্ট স্থানে আন্তর্জাতিক মানের কমন বাথরুম ও টয়লেট কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হবে। পর্যাপ্ত পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে। তারা চব্বিশ ঘণ্টা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে নিয়োজিত থাকবেন।
দরগাহের পুকুরটি আধুনিক নকশায় সুইমিং পুলের মতো সংস্কার করা যেতে পারে। স্বচ্ছ পানি প্রবাহের ব্যবস্থা থাকবে। একদিকে বিশুদ্ধ পানি প্রবেশ করবে, অন্যদিকে ময়লা পানি নিষ্কাশিত হবে । বিভিন্ন প্রজাতির দৃষ্টিনন্দন মাছ সংরক্ষণ করা হবে। চারপাশে বসার উন্নত ব্যবস্থা থাকবে। দর্শনার্থীরা সেখানে বসে সময় কাটাবেন, বিশ্রাম নেবেন, প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করবেন।
পর্যাপ্ত পর্যটন পুলিশ নিয়োজিত থাকবে। প্রয়োজনে একটি পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রও স্থাপন করা হবে। টাউট, বাটপার ও পকেটমারমুক্ত একটি নিরাপদ এলাকা গড়ে তুলতে হবে। যাতে দেশ-বিদেশ থেকে আগত দর্শনার্থীরা নিশ্চিন্তে মাজার পরিদর্শন করতে পারেন।
তাহলেই দেখা যাবে, শাহজালালের মাজার বিশ্বের অন্যতম আকর্ষণীয় ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হবে। শুধু দেশের ভেতর থেকেই নয়, দর্শনার্থীরা আসবে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে। তখন আয়ও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। সেই আয় দিয়ে দরগাহ পরিচালনার পাশাপাশি সিলেটে বিভিন্ন শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা সম্ভব হবে। কওমি মাদ্রাসা, এতিমখানা এবং জনকল্যাণমূলক বহু প্রতিষ্ঠান এই অর্থের সুফল পেতে পারে।
মাজারের অর্থ তো মাজারের উন্নয়নেই ব্যয় হওয়ার কথা। মাজারে যে গরিব-মিসকিনরা আসে, তাদের কল্যাণেই ব্যয় হওয়ার কথা। এটি তাদের প্রাপ্য। এটি তাদের প্রাপ্য নয়, যারা সম্পদের পাহাড় গড়েছেন ।
এখন প্রশ্ন হলো—এই কাজ কে করবে? সিলেটে এখন দুইজন মন্ত্রী আছেন। প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী, সিলেট সিটির সাবেক জননন্দিত মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী এবং বাণিজ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ আব্দুল মুক্তাদির। এই দুই মন্ত্রীই উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারেন । তাঁরা চাইলে মাজারে আর কোনো ধরনের লুটপাট হতে দেবেন না।
আরিফুল হক চৌধুরী, আপনি ইতোমধ্যে সিলেট শহরের রাস্তাঘাট সম্প্রসারণে যুগান্তকারী পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করে নগরবাসীর প্রশংসা কুড়িয়েছেন। এবার মানুষ আপনার আরেকটি সাহসী পদক্ষেপ দেখতে চায়। ক্ষমতায় তো আপনারাই আছেন। সিটি প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুমও আপনাদেরই।
ডিসি সারওয়ার আলমের নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো যদি স্থায়ী করা যায়, তাহলে শুধু মাজারের দৃশ্যই পাল্টাবে না, পাল্টে যাবে পুরো সিলেট নগরের চিত্র। সিলেট হয়ে উঠতে পারে বিশ্বের অন্যতম আকর্ষণীয় ভ্রমণ ও ধর্মীয় পর্যটন গন্তব্য।
এখন দেখার বিষয়, দুই মন্ত্রী কী করেন। তাঁরা নীরব । কিন্তু জনগণ আর নীরব নয়। জনগণ এখন অনেক বেশি সচেতন । আগের মতো অন্ধকারে লুটপাট চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ আর নেই। ডিসি সারওয়ার আলম মানুষের চোখ খুলে দিয়েছেন । তাই এখন যা কিছু করা হবে, তা ভেবেচিন্তেই করতে হবে। অপেক্ষায় আছে সিলেটবাসী ।
তাইসির মাহমুদ
সম্পাদক, সাপ্তাহিক দেশ, লন্ডন
সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট, লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাব


