প্রধানমন্ত্রীর চ্যালেঞ্জের পর গ্যাস-বিদ্যুতের পরিকল্পনা দিল বিরোধী দল
প্রকাশিত হয়েছে : ১৬ আগস্ট ২০২৬
দেশ ডেস্ক, ১৬ আগস্ট ২০২৬:: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চ্যালেঞ্জের পর গ্যাস বিদ্যুতের সংকট নিরসনে পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে জামায়াতে ইসলামী। পাল্টা চ্যালেঞ্জ করে বলেছে, বিদ্যমান কূপগুলো ওভারওয়ার্ক (সংস্কার) করে দ্রুত গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধির সুপারিশসহ যেসব পরিকল্পনা বিরোধী দল সংসদীয় কমিটিতে দিয়েছিল, তিন মাসে এর অগ্রগতি কী তা সরকার প্রকাশ করুক।
আজ রোববার রাজধানীর মগবাজারে দলীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেছেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। গত শনিবার রাজধানীতে জনসভায় প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আপনাদের যদি এমন কোনো পরিকল্পনা থাকে, যা দিয়ে আগামী ছয় মাসের মধ্যে গ্যাস-বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান করা যাবে, তাহলে সেটা দেন। আমরা অবশ্যই তা গ্রহণ করব। আমি আপনাদের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলাম।’
পরেরদিন বিরোধী দলের পরিকল্পনা তুলে ধরে গোলাম পরওয়ার বলেন, ১০ বছরের অজুহাত দেখাবেন না। জনগণের দুর্ভোগ দূরে সরকার চাইলে জরুরি পদক্ষেপ নিতে পারে। গ্যাস, বিদ্যুতের অবৈধ লাইন বন্ধ করতে পারে, ভুতুড়ে বিল বন্ধ করতে পারে। বিদ্যুৎকেন্দ্রে ক্যাপাসিটি চার্জে যে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট হয়েছে, এগুলো বন্ধ করুন। সিন্ডিকেট ও লুটপাটের মার্কেট করে রেখেছে সরকার। এগুলো বন্ধ করে হাজার হাজার কোটি টাকা বাঁচানো যায়, সেদিকে সরকারের নজর নেই। তাদের নজর বিরোধী দলের আন্দোলনের দিকে। গণভোটের গণরায় কার্যকর না করে তো উপায় নেই। তাই সরকার বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের বক্তব্যের সমালোচনা করে গোলাম পরওয়ার বলেছেন, কেউ বলেন সমস্যা সমাধানে ১০ বছর লাগবে, কেউ বলেন দুই বছর। তাঁদের কথার মিল নেই। আগে নিজেদের মধ্যে সালিশটা মিটিয়ে নিক। জামায়াত প্রধান বিরোধী দল হিসেবে প্রস্তাবনা দিয়েছে। সরকারের সক্ষমতা থাকলে বাস্তবায়ন করে জাতিকে বলুক।
গোলাম পরওয়ার বলেন, সরকারকে ব্যর্থ দেখতে চাই না। জ্বালানি সংকটে সরকার ব্যর্থ হলে দেশও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
গোলাম পরওয়ার লিখিত বক্তব্যে জ্বালানি খাতের সংকট নিয়ে জামায়াতের পরিকল্পনা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ২১ মে জ্বালানি সংকটসংক্রান্ত বিশেষ কমিটিতে বিরোধী দল ১০ দফা সুপারিশ জমা দিয়েছিল। ৭ জুন জ্বালানিমন্ত্রী সেই প্রতিবেদন সংসদে উপস্থাপন করেন। বিরোধী দলের প্রস্তাবনা ছিল, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধিতে বিদ্যমান কূপ ওয়ার্কওভার করা, ভোলা, জামালপুর ও জকিগঞ্জের গ্যাসকে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা, স্থলভাগ ও সমুদ্রভাগে অনুসন্ধান জোরদার, স্থাপিত এসপিএম দ্রুত চালু, ডিপো থেকে গ্রাহক পর্যায় পর্যন্ত ডিজিটাল মনিটরিং, কার্যকর নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণ এবং ভবিষ্যৎ জ্বালানি চাহিদা নিরূপণে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করা।
এইসব পরিকল্পনা কতটা বাস্তবায়ন হয়েছে? নাকি কাগজেই পড়ে আছে? এসব প্রশ্ন তুলে গোলাম পরওয়ার বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর পরিষ্কার করতে হবে। সংকট সমাধানে বিরোধীদলীয় নেতা সংসদের বিশেষ অধিবেশন আহ্বানে চিঠি দিলেও সরকার সাড়া দেয়নি।
গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের প্রতিবাদে আয়োজিত জনসভার মঞ্চে সামনে হারিকেন ও পেছনে ফ্যান চালানো নিয়ে প্রধানমন্ত্রী যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা পরিস্থিতি মূল্যায়নের মানদণ্ড হতে পারে না বলে মন্তব্য করেন গোলাম পরওয়ার।
বিরোধী দল সংকট নিয়ে হঠকারিতা ও বিভ্রান্তির রাজনীতি করছে- প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যে গোলাম পরওয়ার বলেছেন, একজন মানুষ যখন গ্যাস চান, তিনি অরাজকতা চান না। একজন শ্রমিক যখন কারখানা চালু রাখার দাবি করেন, তিনি ষড়যন্ত্র করেন না। একজন উদ্যোক্তা যখন নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি চান, তিনি সরকারের শত্রু নন। মানুষ চুলায় গ্যাস চায়, কারখানায় উৎপাদন চায়, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ চায়। এ দাবির জবাব রাজনৈতিক ব্যঙ্গ দিয়ে নয়, কার্যকর সমাধান দিয়ে দেওয়া উচিত।
সরকার গ্যাস আমদানি সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সাগরে তৃতীয় টার্মিনাল স্থাপনের পরিকল্পনা করছে। জামায়াত সেক্রেটারি জেনারেল বলেছেন, এর বিরোধিতা করছি না। আমদানি করা এলএনজি গ্রহণের সক্ষমতা যেমন বৃদ্ধি করতে হবে, তেমন জনগণকে সত্য বলতে হবে। টার্মিনাল থেকে তো গ্যাস উৎপাদন হয় না। টার্মিনাল সচল রাখতে আমদানি করা গ্যাস কিনতে বৈদেশিক মুদ্রা প্রয়োজন। এলএনজি গ্যাসে রূপান্তর করে জাতীয় গ্রিডে পাঠাতে পর্যাপ্ত পাইপলাইন প্রয়োজন। গত অর্থবছর এলএনজি আমদানিতে প্রায় ৫৯ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। ১৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকা সরকারি ভর্তুকি দিতে হয়েছে।
গোলাম পরওয়ার বলেছেন, টার্মিনাল নির্মাণের সঙ্গে সঙ্গে সরকারকে বলতে হবে এলএনজি কোথা থেকে কত দামে আমদানি করেছে। দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি কী হবে, পাইপলাইন কখন হবে, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কত বাড়বে, এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ছাড়া একটি টার্মিনাল নির্মাণ সমাধান নয়।
তিন মাসের পরিকল্পনা তুলে ধরে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, বিরোধী দল জনগণকে অবাস্তব প্রতিশ্রুতি দিতে চায় না। গোলাম পরওয়ার বলেন, ৯০ দিনে সাগরে অনুসন্ধান, নতুন পাইপলাইন নির্মাণ, তেলের পরিশোধনাগার নির্মাণ সম্ভব নয়। কিন্তু ৯০ দিনে পুরনো গ্যাসকূপে ওয়ার্কওভারসহ ছয়টি কাজ সম্ভব।
জামায়াত সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, প্রথম ১৫ দিনে পেট্রোবাংলা ও বাপেক্স ওয়ার্কওভারযোগ্য কূপের অগ্রাধিকার তালিকা প্রকাশ করুক। ৩০ দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় অনুমোদন শেষ করুক। ৯০ দিনের কাজ শুরু করে জনগণকে জানানো হোক— কত মিলিয়ন ঘনফুট নতুন গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
গোলাম পরওয়ার বলেন, বন্ধ ও কম উৎপাদনশীল কূপের তালিকা প্রকাশ করে কোনটি কী কারণে বন্ধ এবং কী ধরনের সংস্কার করলে আবার উৎপাদন সম্ভব হবে, তা ৩০ দিনে প্রকাশ করা হোক।
ভোলার গ্যাস ব্যবহারে অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব দিয়ে গোলাম পরওয়ার বলেছেন, পাইপলাইন তিন মাসে হবে না। কিন্তু সিএনজি বা এলএনজিতে রূপান্তর করে তা আপাতত আনা যায়।
সিস্টেম লস ও অবৈধ গ্যাস সংযোগের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তাব দিয়ে গোলাম পরওয়ার বলেন, ৯০ দিনের লক্ষ্য নির্ধারণ করে প্রতি সপ্তাহে অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্নের পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হোক।
গ্যাস বণ্টনের প্রকাশ্য সময়সূচি প্রকাশের প্রস্তাব করে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ঘাটতি না লুকিয়ে কোন সময়ে কোন খাত গ্যাস পাবে, এর সময়সূচি প্রকাশ করা হোক। এতে একজন গৃহিণী জানবেন কখন চুলা জ্বলবে। শিল্পোদ্যোক্তা জানতে পারবেন, কখন উৎপাদন করতে পারবেন। যে অবকাঠামো ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে, তা ফেলে রেখে নতুন প্রকল্পের ঘোষণা দিয়ে লাভ নেই। সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং দ্রুত কার্যকর করতে হবে।
চারটি প্রশাসনিক সংস্কারের প্রস্তাব দিয়ে গোলাম পরওয়ার বলেছেন, সব অংশীজনকে নিয়ে জাতীয় জরুরি জ্বালানি সেল গঠন করা হোক। নির্দিষ্ট আর্থিক সীমার মধ্যে জরুরি ওয়ার্কওভার ও সংস্কারকাজের অনুমোদন ক্ষমতা পেট্রোবাংলা ও বাপেক্সের পরিচালনা পর্ষদকে দেওয়া হোক। রূপপুর কেন্দ্র কবে উৎপাদনে আসবে এবং বিদ্যুতের দাম কী হবে, তা জানানো হোক। জরুরি দরপত্র মূল্যায়নের জন্য স্থায়ী মূল্যায়ন ব্যবস্থা তৈরি করা হোক। খুলনার খালিশপুরে ৮০০ মেগাওয়াটের রূপসা বিদ্যুৎকেন্দ্র কেন উৎপাদনে যাচ্ছে না-এই প্রশ্নও তুলেছে জামায়াত।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম মা’ছুম, হামিদুর রহমান আযাদ, আবদুল হালিম, নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন এমপি, নূরুল ইসলাম বুলবুল এমপি, শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি প্রমুখ।

