মৌলভীবাজারের হাওর ধ্বংস করে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প কার স্বার্থে?
প্রকাশিত হয়েছে : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আবু নাসের চৌধুরী রাহী
বাংলাদেশ নদী, হাওর, বিল ও জলাভূমির দেশ । দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীর খাদ্য, কৃষি, মৎস্য ও জীবিকার সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে আছে এসব প্রাকৃতিক জলাধার । কিন্তু অপরিকল্পিত উন্নয়ন, জলাভূমি ভরাট, নদী-নালা দখল ও বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের কারণে হুমকির মুখে পড়ছে হাওরের স্বাভাবিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য।
সম্প্রতি মৌলভীবাজারের বিভিন্ন হাওরে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের উদ্যোগ নিয়ে দেখা দিয়েছে নতুন বিতর্ক। ব্যক্তিমালিকানাধীন কৃষিজমি ক্রয় এবং সরকারি খাস জমি দখলের মাধ্যমে হাওরের জমি প্রকল্পের আওতায় নেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ ওঠেছে । এর বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে ‘হাওর রক্ষা আন্দোলন, মৌলভীবাজার’।
মৌলভীবাজার চা-বাগান, পাহাড়, নদী-ছড়া আর বিস্তীর্ণ হাওরের জেলা । জেলার প্রাকৃতিক প্রতিবেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হাকালুকি,কাউয়াদীঘি, হাইল ও পূবের হাওরসহ বিভিন্ন জলাভূমি । এসব হাওরেই সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের উদ্যোগ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
‘হাওর রক্ষা আন্দোলন’-অভিযোগ করেছে বিদ্যুৎ উৎপাদনের নামে ইতিমধ্যে প্রাণ আরএফএল গ্রুপ, আজম জে চৌধুরীর ইসি হোল্ডিং সহ কিছু কোম্পানি কাউয়াদিঘি ও হাইল হাওরের ৭-৮ হাজার একর ভুমি- জলাভূমি ও কৃষিজমি ক্রয় করছে এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে হাওরকে ভরাট করে শিল্পায়নের পরিকল্পনা গ্রহণ করছে ।
হাওর রক্ষায় ইতোমধ্যে আইন হয়েছে । অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ২০২৬ সালের ১৪ জানুয়ারি ‘বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি সংরক্ষণ অধ্যাদেশ’ জারি করে । পরে জাতীয় সংসদে আইন হিসেবে তা কার্যকর হয়েছে ‘বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি সংরক্ষণ আইন, ২০২৬’ নামে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—আইন হওয়ার পরও উন্নয়নের নামে হাওর, নদী ও জলাভূমির স্বাভাবিক পরিবেশ কতটা সুরক্ষিত? বিশেষ করে বিদ্যুৎ উৎপাদন কিংবা বড় কোনো অবকাঠামো প্রকল্প নেওয়ার আগে পরিবেশগত প্রভাব, পানির স্বাভাবিক প্রবাহ এবং স্থানীয় মানুষের জীবিকার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।
হাওর রক্ষা করতে হলে প্রথমেই হাওরের সীমানা ও আয়তন সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে । হাওর ও জলাভূমি সংরক্ষণ আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে এবং উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের আগে পরিবেশগত ও কারিগরি সম্ভাব্যতা যাচাই জরুরি।
এছাড়া হাওরের প্রাকৃতিক মাছের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র রক্ষা, নদী-খাল পুনঃখনন ও পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখা ও স্থানীয় কৃষক, জেলে ও হাওরনির্ভর জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকার বিষয়টিও উন্নয়ন পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করার দাবি রয়েছে।
পরিবেশকর্মীদের মতে, হাওরের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য নষ্ট হলে এর প্রভাব শুধু একটি অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। জলবায়ু পরিবর্তন, বন্যা, খাদ্যনিরাপত্তা এবং জীববৈচিত্র্যের ওপরও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে। উন্নয়ন বন্ধ নয়—বরং প্রকৃতি ও পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করার আহ্বান জানাচ্ছেন তারা।

হাওর রক্ষা আন্দোলন, মৌলভীবাজার মনে করে “উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু এমন উন্নয়ন চাই, যে উন্নয়ন হাওর, নদী, কৃষি, মৎস্য ও মানুষের জীবন-জীবিকা ধ্বংস করবে না। প্রকৃতিকে বাদ দিয়ে করা উন্নয়ন দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হতে পারে না।”
জলবায়ু অর্থায়ন জাতিসংঘের একাধিক সংস্থা ও আন্তর্জাতিক তহবিলের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকল্পে আসে। বর্তমান তথ্য অনুযায়ী গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি তথ্য হলো:
Green Climate Fund (GCF): বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত প্রায় ৪৬৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার GCF financing অনুমোদিত হয়েছে। এর বাইরে readiness support হিসেবে আরও ৬.১ মিলিয়ন ডলার অনুমোদিত হয়েছে।
* বাংলাদেশের NDC 3.0 (Nationally Determined Contributions)-তে বলা হয়েছে, GCF-এর মাধ্যমে বাংলাদেশ ৭টি একক-দেশীয় ও ২টি বহু-দেশীয় প্রকল্পে ৫৮৭ মিলিয়ন ডলারের বেশি অনুমোদিত অর্থায়ন পেয়েছে।
* ২০২৫ সালে UNOPS(United Nations Office for Project Services)-এর মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত রোগ মোকাবিলা ও আগাম সতর্কতা ব্যবস্থার জন্য ১.৬ মিলিয়ন ডলারের একটি প্রকল্প নেওয়া হয়।
* ২০২৪ সালে বন্যার আগাম প্রস্তুতি ও সহায়তায় জাতিসংঘের CERF(The Central Emergency Response Fund )ও অংশীদারদের মাধ্যমে প্রায় ৮.৯ মিলিয়ন ডলার দেওয়া হয়েছিল, যা প্রায় ৬ লাখ মানুষকে সহায়তা করে।
তাই এখন প্রশ্ন হলো কত টাকা পাওয়া গেল? এই অর্থ কোথায় যাচ্ছে? কতটা প্রকৃতি রক্ষায় ব্যয় হচ্ছে? আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলায় কোটি কোটি টাকা ব্যয় করার পরও যদি হাওর, নদী-নালা ও জলাভূমির স্বাভাবিক প্রতিবেশ ধ্বংস করা হয়, তাহলে সেই উন্নয়ন কি সত্যিই জলবায়ুবান্ধব?
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিরাপদ রাখতে প্রয়োজন এমন উন্নয়ন, যেখানে বিদ্যুৎ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি হাওর, নদী, কৃষি, মৎস্য ও জীববৈচিত্র্যও নিরাপদ থাকবে। কারণ হাওর বাঁচলে শুধু প্রকৃতি নয়—বাঁচবে মানুষের জীবন, খাদ্যনিরাপত্তা এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ।
আবু নাসের চৌধুরী রাহী : সাংবাদিক, পোর্টসমাউথ, যুক্তরাজ্য


