শাহজালাল (রহ:) মাজার : সেদিন এক কোণে দাঁড়িয়ে যা দেখেছিলাম
প্রকাশিত হয়েছে : ১৫ জুন ২০২৬
তাইসির মাহমুদ: সিলেট গেলে একবার শাহজালাল (রহ:) মাজারে যাওয়ার চেষ্টা করি। গতবারও যখন যাই, তখন একনজর মাজার ঘুরে আসি। একটা বিষয় দীর্ঘদিন যাবৎ লক্ষ্য করে আসছি। চারদিকে দেয়ালঘেরা মাজারের ভেতরে মানুষ টাকা ছিটিয়ে দেয়। সম্ভবত এই বিশ্বাসে যে, শাহজালালের রুহ কবর থেকে দেখতে পারবেন কে টাকাটা দিচ্ছেন।
মূল মাজারে প্রবেশ করেই হাতের ডান দিকের কর্নারে চার দেয়ালের কোণে দাঁড়িয়ে থাকেন ৪/৫ জন মানুষ। তারা মানুষের কাছ থেকে টাকা বুঝে রাখেন। আগন্তুকদের মধ্যে কেউ স্বেচ্ছায় দেন। কখনো দাঁড়িয়ে থাকা খাদেমরা মান্নত আছে কিনা জানতে চান। মান্নত থাকলে এখানেই দিতে বলেন। ওয়ালের ওপর তারা টাকাগুলো গুনতে থাকেন, নাড়াচাড়া করেন।
আমি যখনই মাজারে যাই, খানিক দূর থেকে মানুষগুলোর অঙ্গভঙ্গি পর্যবেক্ষণ করি। দেখতে পাই, টাকাগুলো তারা শুধু নাড়াচাড়া করছে।
প্রায় দুই যুগ আগের একটি অভিজ্ঞতা শেয়ার করব। একদিন সম্ভবত জুমার নামাজ শেষে মাজারে ঢুকলাম। দেখলাম, সাদা পাঞ্জাবি পরা একজন মুরব্বি ডান দিকের কর্নারে মাজারের দেয়াল সামনে রেখে একাই দাঁড়িয়ে আছেন। টাকা নাড়াচাড়া করছেন। আমি তাঁর দিকে দূর থেকে দৃষ্টি রাখছিলাম। হঠাৎ দেখলাম, গোনাগুনির ফাঁকে একটি লাল নোট পাঞ্জাবির ডান পকেটে ঢুকিয়ে দিলেন। এরপর আরও কিছুক্ষণ নাড়াচাড়া করলেন। তারপর সেখানে আরও দুইজন লোক এলো। তিনি আরও কিছুক্ষণ টাকা নাড়াচাড়া করলেন। এরপর সেখান থেকে বেরিয়ে গেলেন।
আমার প্রচণ্ড কৌতূহল চাপল—দেখতে হবে ব্যক্তিটি কে! আমি তাঁর পিছু নিলাম। নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে হাঁটতে থাকলাম। দেখলাম, মাজার থেকে বেরিয়ে গিয়ে তিনি বাইরে একটি দোকানে কিছু শপিং করলেন। এরপর ব্যাগটি হাতে নিয়ে আলিয়া মাদ্রাসা মাঠের পাশ দিয়ে হেঁটে একটি দেয়ালঘেরা বাসায় ঢুকে পড়লেন। তিনি আমার দৃষ্টির আড়াল হয়ে গেলে আমিও আমার পথে চলে গেলাম।
ঘটনাটি আজই প্রথম শেয়ার করলাম। কারণ সিলেটের মাজারের অর্থ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সিলেটের ডিসি সারওয়ার আলম মাজার পরিদর্শনে গিয়ে দেখেছেন, মাজারের অর্থের কোনো হিসাব-নিকাশ নেই। মাজারের মোতোয়াল্লি ফতেহ উল্লাহ আল আমান দান-খয়রাতের অর্থ ভোগ করার বিষয়টি স্বীকার করে ডিসিকে বলেছেন, ‘আয়ের কোনো নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নেই, কারণ তা প্রতি মাসে সমান হয় না। যে টাকা আয় হয়, তা দিয়ে মাজারের বিদ্যুৎ বিল, পানির বিল এবং কর্মচারীদের বেতন দেওয়া হয়।’
তিনি এও বলেছেন, “আমরা যে খাচ্ছি না তা নয়। আমরা খাচ্ছি, মাজারের খরচও বহন করছি। এভাবেই এত বছর ধরে চলে আসছে।”
ওই যে দাড়ি-টুপি পরা হুজুর লাল একটি নোট পকেটে গুজে নিয়ে গেলেন—তিনি মাজারের কী? একেবারে প্রকাশ্যেই নিয়ে গেলেন! মনে হলো যেন গনিমতের মালের মতোই। আল্লাহ তায়ালা মাজারের খাদেম করে দিয়েছেন। যখনই দরকার, মাজারের কর্নারে গিয়ে দাঁড়ালাম। কিছুক্ষণ টাকা গুনাগুনি, নাড়াচাড়া, ভাজ করার দায়িত্ব আঞ্জাম দিলাম। এরপর ফেরার পথে কিছু পকেটে ভরে নিয়ে এলাম। ফেরার পথে বাচ্চা-কাচ্চার জন্য বাজার-সদাইও করে নিয়ে গেলাম।
কাজ নেই, কাম নেই। মাজারে যাওয়া আর আরামে বসে বসে খাওয়া। যেন ঈসা (আ.)-এর মা মারিয়াম (আ.)-এর মতো অবস্থা। বায়তুল মুকাদ্দাসের লাগোয়া যে কক্ষে তিনি থাকতেন, সেখানে গায়েব থেকে খাবার আসত। এখানে মাজারে আল্লাহ তায়ালাই প্রেরণ করছেন!
যারা খাচ্ছে, তারা শাহজালালের মাজারের খাদেম-উত্তরসূরি। তাদেরকে ঘরে এসির নিচে বসিয়ে কোনো কাজকর্ম ছাড়া খাওয়ানোর দায়িত্ব যেন আল্লাহ তায়ালার। আর এই টাকা দিয়ে যাবেন গরিব অসহায় রিকশাচালক, ঠেলাগাড়ি চালক, দিনমজুর—যারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে রোজি করছে। একদিন খাচ্ছে তো অন্যদিন উপোস থাকছে। তারাই রোগ-শোকে ডাক্তারের কাছে যেতে পারছে না। ৬০০ টাকার ভিজিট জোগাড় করতে পারে না। তাই রোগমুক্তির ডাইরেক্ট পথ—শাহজালালের মাজারে মান্নত। মাজারের ভেতরে টাকা ফেলে দোয়া চাইলে তিনি সুস্থ করে দেবেন।
কিন্তু সেই টাকায় পেট পুরছে একদল পেটপূজারির। কত নিরাপদ রোজগার! কোনো কিছু করতে হয়না। আপসে আসছে, আর আমরা খাইতেছি। আমাদের চৌদ্দগোষ্ঠী খেয়ে আসছে।
এই অবস্থার উত্তরণ দরকার। গরিব মানুষ মাজারে গিয়ে আরও গরিব হচ্ছে। ধনীরা মাজারের টাকায় আরও ধনী হচ্ছে।
সারওয়ার আলম একজন সৎ, নিষ্ঠাবান ও সাহসী জেলা প্রশাসক। তাঁর উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই। কিন্তু তিনি কি পারবেন? কারণ মাজারের এই আয়-ইনকাম শুধু এই খাদেমগোষ্ঠীই ভক্ষণ করে না। সিলেটকে যারা নিয়ন্ত্রণ করেন, তাদের ঘরেও একটি ভাগ অটোমেটিক যায়। নাম বলে লজ্জা দিতে চাই না।
যাক, মাজারে মান্নতের টাকা দেওয়া সম্ভবত বন্ধ করা যাবে না। যারা টাকা দেয়, তাদেরকে এর কুফলও বুঝানো যাবে না। সেটা তো সম্ভব নয়।
তবে টাকার হিসাবটাকে অন্তত সিস্টেমের মধ্যে নিয়ে আসা উচিত।
মাজারে ক্যাশ টাকা ছুড়ে ফেলা কিংবা দাঁড়িয়ে থাকা খাদেমদের হাতে টাকা দেওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। তালাবদ্ধ দানবাক্সে টাকা দিতে হবে। প্রয়োজনে কার্ড মেশিন বসানো যেতে পারে। মানুষ ব্যাংক কার্ড ট্যাপ করে টাকা দিতে পারবেন। তাহলে সেই টাকা সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে চলে যাবে।
আর ক্যাশ দানবাক্স মাস শেষে যখন খোলা হবে, তখন সেখানে মাজারের খাদেম, জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা, পুলিশ ও সাংবাদিকরা উপস্থিত থাকবেন। লাইভ গণনা হবে। তাহলে হয়তো মাজারের টাকার ওপর কিছুটা নিয়ন্ত্রণ আনা যাবে।
ধন্যবাদ ডিসি সারওয়ার আলম। এই উদ্যোগের জন্য আপনাকে সাধুবাদ।
তাইসির মাহমুদ: সম্পাদক, সাপ্তাহিক দেশ, লন্ডন। সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট, লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাব।

