সিলেটে ট্রিপল মার্ডার : উত্তর মিলছে না অনেক প্রশ্নের
প্রকাশিত হয়েছে : ১৩ আগস্ট ২০২৬
দেশ ডেস্ক, ১৩ আগস্ট ২০২৬:: কয়েকটি প্রশ্নের কোনো উত্তর মিলছে না সিলেটের ট্রিপল মার্ডারের ক্ষেত্রে। এদিকে চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশের দ্রুত পদক্ষেপ ও ‘অপরাধী’ গ্রেপ্তারের খবর ছড়িয়ে পড়েছে। তবে ঘটনার নেপথ্য কারণ কী, তা নিয়ে জনমনে সৃষ্টি হয়েছে ধোঁয়াশা।
পেশায় রংমিস্ত্রি ও পার্টটাইম কসাই বাবুল মিয়াকে (৪০) সিলেটের রায়নগরের মিতালী ১১১ নম্বর বাড়িতে গত বুধবার সকালে ঘটে যাওয়া হত্যাকাণ্ডের চার ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ জানায়, ওই বাড়ির গৃহকর্মী তাহমিনার সঙ্গে ২০ দিনের প্রেমের সম্পর্ক ছিল বাবুলের। শারীরিক সম্পর্কের টানাপোড়েন থেকেই ঘটে ট্রিপল মার্ডার।
পুলিশের এই ব্যাখ্যা ও বয়ান মেনে নিতে পারছেন না নিহতের স্বজন, স্থানীয় বাসিন্দা, এমনকি অপরাধ বিশ্লেষকেরাও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে সিলেটের সর্বত্র এখন একটাই প্রশ্ন- ঘটনার সত্যতা ঢেকে দিয়ে কি নতুন কোনো ‘জজ মিয়া নাটক’ সাজানো হচ্ছে? ঘটনা বিশ্লেষণে শুরুতেই উঠে আসে সময়ের অমিল।
একজন ভাড়াটিয়া স্পষ্ট জানিয়েছেন, সকালে যখন চিৎকার শুনে তারা মই দিয়ে উঠে রক্ত দেখতে পান, তখনো কোনো রংমিস্ত্রি কিংবা কাজের লোক আসেনি। তাদের চিৎকার শুনে কাজের লোকেরা সেখানে জড়ো হন। তাহলে রংমিস্ত্রি বাবুল ঠিক কখন বাসায় এলেন? তাদের মধ্যে যদি প্রেমের সম্পর্ক থেকেই থাকে, তবে গোপনে আসার কথা। আর বাবুল যদি ওই বাসায় রঙের কাজই করে থাকেন, তবে গোপনে আসবেন কেন?
অন্যদিকে সংবাদমাধ্যমে পুলিশ প্রথম থেকেই আলমারি ও ওয়ার্ডরোব খোলা দেখে চুরি বা ডাকাতির সন্দেহের কথা জানায়। এদিকে বিএনপির স্থানীয় নেতা ও সিলেট উন্নয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রেজাউল হাসান কয়েস লোদী ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে সে সময় গণমাধ্যমকে জানান, ঘটনাস্থল দেখে এটি কোনো সাধারণ চুরি বা ডাকাতি মনে হচ্ছে না। পুলিশ যেখানে এককভাবে বাবুলকে দায়ী করছে, সেখানে স্থানীয় এই নেতা ‘খুনিরা’ ও ‘তারা’ শব্দগুলো ব্যবহার করে একাধিক ব্যক্তির সম্পৃক্ততার দিকে ইঙ্গিত দেন। পাশাপাশি স্থানীয় আরেক বাসিন্দা জানান, মদনমোহন কলেজের সামনে নিহতদের সম্পত্তি নিয়ে পূর্ববিরোধ ও ঝামেলা চলছিল। তার রেশ ধরে ট্রিপল মার্ডার হতে পারে। সম্পত্তিটি নিয়ে আদালতে মামলা ছিল।
হত্যাকাণ্ডের স্থান ও লাশের অবস্থান নিয়েও ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। পুলিশ সূত্রে প্রথমে প্রচার করা হয়, গৃহপরিচারিকার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কের টানাপোড়েন থেকে ঘটনার সূত্রপাত। তার চিৎকারে গৃহকর্ত্রী ও পরে গৃহকর্তা এগিয়ে এলে তাদেরও হত্যা করা হয়।
কিন্তু ভাড়াটিয়াদের ভাষ্যমতে, কাজের মেয়ের লাশ মেলে রান্নাঘরে, গৃহকর্ত্রীর লাশ তার বেডরুমে এবং গৃহকর্তার লাশ ড্রয়িংরুমে। প্রশ্ন উঠছে, খুন যদি রান্নাঘরে না হয়ে থাকে, তবে একজন অপরজনকে বাঁচাতে গিয়ে তিনজনের লাশ তিনটি ঘরে পৌঁছাল কীভাবে?
এদিকে সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, গৃহকর্মী রান্নাঘর থেকে বের হওয়ার পরপরই গৃহকর্ত্রী সেখানে ঢোকেন এবং অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে গৃহকর্মীর চিৎকার শুনে তিনি বাইরে ছুটে যান। সিসিটিভি ফুটেজ অনুসারে, রান্নাঘরে কোনো অঘটন ঘটেনি। এ ছাড়া রান্নাঘর থেকে বের হয়েই গৃহকর্মী চিৎকার দিয়েছেন, যার অর্থ- বাবুলের সঙ্গে বাগবিতণ্ডা বা তর্ক করার মতো ন্যূনতম সময়ও সেখানে ছিল না। তবে কি বাবুল ছাড়া অপরিচিত কাউকে দেখে ভয় পেয়ে মেয়েটি চিৎকার দিয়েছিলেন? নাকি মূল খুনি দলে একাধিক ব্যক্তি ছিল, যারা যাকে যে রুমে পেয়েছে, সেখানেই হত্যা করেছে?
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, পারিবারিক ও অপরাধবিদ্যার স্বাভাবিক নীতি থেকেও পুলিশের গল্পটি প্রশ্নের মুখে পড়ে। নিহত তাহমিনার বয়স ও ছবি দেখলে স্পষ্ট বোঝা যায়, সে অল্প বয়সী। অন্যদিকে বাবুল চল্লিশোর্ধ্ব। তাদের মধ্যে ‘প্রেমের সম্পর্ক’ বাস্তবে কতটা স্বাভাবিক, তা নিয়ে জনমনে সংশয় রয়েছে। তা ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যেখানে বলছিল, সিসিটিভি ক্যামেরা এড়াতে লোডশেডিংয়ের সুযোগ নেওয়া হয়েছিল, সেখানে রান্নাঘরের সিসিটিভি ক্যামেরা পুরো সময় সচল ছিল কীভাবে?
পুলিশের দেওয়া বর্ণনায় বলা হয়েছে, সকাল ৯টা ২৫ থেকে ৯টা ৩৫ মিনিটের মধ্যে বাবুল ওই বাসায় প্রবেশ করেন। তখন শারীরিক সম্পর্ক নিয়ে তাহমিনার সঙ্গে তার ঝগড়া হয়। এ সময় সঙ্গে আনা ছুরি দিয়ে পরপর তিনজনকে হত্যা করেন বাবুল। পরে পাশের খালি প্লটে ছুরিটি ফেলে দিয়ে ওই এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন বাবুল। ঘটনার চার ঘণ্টার মাথায় তাকে আটক করা হয় এবং তিনি দোষ স্বীকার করেন।
সাধারণের প্রশ্ন, শারীরিক সম্পর্কের জন্য সকাল সাড়ে ৯টা কি উপযুক্ত সময়? যদি উদ্দেশ্য কেবল শারীরিক সম্পর্কই হয়, তবে খুন করার জন্য ভারী ছুরি নিয়ে আসার প্রয়োজন কি ছিল? ঠান্ডা মাথায় তিনটি খুন করার পর একজন পেশাদার বা অপেশাদার খুনি কেন বাসার পাশের খালি জায়গায় ছুরি ফেলবে এবং আটক হওয়ার আগে পর্যন্ত কেনই বা ওই পাড়ায় ঘোরাঘুরি করবে? সবচেয়ে বড় কথা, তিনটি হত্যাকাণ্ডের পর কোনো খুনি এত সহজে ও বিনা দ্বিধায় পুলিশের কাছে পুরো ঘটনা স্বীকার করে কীভাবে?
সাবেক একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, মামলার তদন্ত এবং অপরাধবিদ্যার বৈজ্ঞানিক সূত্রগুলোকে এভাবে অবহেলা করা যায় না। তাড়াহুড়ো করে দেওয়া এমন তদন্তের গল্প বাংলা সিনেমার মারামারির দৃশ্যের কথা মনে করিয়ে দেয়, যেখানে খলনায়কের সামনে এক এক করে লোক আসে আর মারা যায়।
এদিকে আরেকটি বিষয়ও রহস্যকে উসকে দিয়েছে। সেটা হলো, ঘটনার পর নিহতদের বাসাবাড়ির কাগজপত্র ও দলিলপত্র খোয়া যাওয়া। বিষয়টি সিলেট মেট্রোপলিটন কমিশনার নিজেই গণমাধ্যমকে জানান। কিন্তু বিকেলে পুরো ঘটনাকে ‘প্রেমঘটিত’ রূপ দেওয়া হয়। ফলে মূল দলিলপত্র কোথায় গেল, সেই প্রশ্ন আড়ালে পড়ে যায়।
সবচেয়ে বড় অসংগতি দেখা গেছে, আসামির পোশাকে। সিসিটিভি ফুটেজে যে গেঞ্জি পরে বাবুলকে প্রবেশ করতে দেখা গেছে, বিকেলে তাকে গ্রেপ্তারের সময়ও তার গায়ে একই টি-শার্ট ছিল। তিনটি মানুষকে ছুরি দিয়ে নির্মমভাবে হত্যার পরও ঘাতকের গেঞ্জিতে রক্ত বা ধস্তাধস্তির কোনো দাগ না থাকা অস্বাভাবিক।
একটি ব্যস্ত সময়ে মূল দরজার লক, রক্তমাখা অস্ত্রের অবস্থান, বাসায় থাকা দ্বিতীয় গৃহকর্মীর হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যাওয়া, আসামির হাতে থাকা রহস্যজনক ‘এন’ চিহ্নের সংকেত এবং কোনো ফরেনসিক বা ডিএনএ পরীক্ষা ছাড়াই তড়িঘড়ি ব্রিফিং দেওয়া- সব মিলিয়ে সিলেটবাসীর মনে সংশয় জাগছে, তদন্তের নামে আবারও কি কোনো ‘জজ মিয়া নাটক’ মঞ্চস্থ হতে যাচ্ছে? গৃহকর্মীর প্রেমের গল্প সামনে এনে আসল অপরাধী ও মূল ষড়যন্ত্রকারীদের আড়াল করার চেষ্টা করা হচ্ছে কি না? এসব প্রশ্নের উত্তরসহ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেন সিলেটবাসী।
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া অফিসার ও অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. মনজুরুল আলম বলেন, ‘প্রাথমিক তথ্য-প্রমাণ ও সন্দেহের ভিত্তিতে আমরা বাবুল মিয়াকে আটক করেছি। তিনি আমাদের কাছে অপরাধ স্বীকার করেছেন। এ ঘটনার সঙ্গে আর কোনো রহস্য বা পক্ষ জড়িত কি না, সেটা আমরা তলিয়ে দেখছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা বেশ কিছু প্রশ্ন নিয়ে সামনে এগোচ্ছি। প্রেমঘটিত কি না বা অন্য কোনো সূত্র জড়িত কি না, সে বিষয়ে তদন্তের স্বার্থে এ মুহূর্তে কিছুই বলা যাচ্ছে না।’
পুলিশ জানায়, হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছুরিটি বাবুল মিয়া রায়নগর এলাকার একটি খালি প্লটে ফেলে দেন। বুধবার সন্ধ্যায় ওই এলাকায় তল্লাশি চালিয়ে সেটা পাওয়া যায়নি। পরে গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে শ্রমিক নিয়ে পুনরায় সেখানে তল্লাশি শুরু করা হয়। একপর্যায়ে ছুরিটি উদ্ধার করা হয়। সেটা ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হবে। ছুরিতে থাকা রক্তের সঙ্গে ঘটনাস্থলে পাওয়া রক্তের নমুনা মিলিয়ে দেখা হবে।
হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে প্রেমের সম্পর্ক, নাকি সম্পত্তিসংক্রান্ত বিরোধ- এমন প্রশ্নের জবাবে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বাবুল মিয়া জানান, রং করার কাজ করতে গিয়ে নিহত গৃহকর্মীর সঙ্গে তার পরিচয় ও যোগাযোগ হয়। তাদের মধ্যে সম্পর্কটি প্রেমের পর্যায়ে গিয়েছিল কি-না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। সবকিছু খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এদিকে বৃহস্পতিবার দুপুরের ফ্লাইটে নিহত মো. আব্দুস সাত্তারের যুক্তরাজ্যপ্রবাসী দুই মেয়ে দেশে এসেছেন। এয়ারপোর্ট থেকে তারা সিলেট এমএজি ওসমানী হাসপাতালে যান। ময়নাতদন্ত শেষে সেখান থেকে আব্দুস সাত্তার ও সুরাইরা বেগমের লাশ নিয়ে রায়নগরের নিজস্ব বাসভবনে ফেরেন তারা। নিহতের ছেলে সাবেক ছাত্রদল নেতা আরিফ ইফতেখারের যুক্তরাষ্ট্র থেকে আজ দেশে আসার কথা। এর পরই মো. আব্দুস সাত্তার ও সুরাইরা বেগমের লাশ দাফন করার কথা রয়েছে। সূত্র : দৈনিক রূপালী বাংলাদেশ

