মহাকাশে ভারতের স্যাটেলাইটের ধ্বংসাবশেষ থেকে যেভাবে রক্ষা পেল বাংলাদেশের স্যাটেলাইট
প্রকাশিত হয়েছে : ০৮ অক্টোবর ২০২৬
দেশ ডেস্ক, ০৮ অক্টোবর ২০২৬:: ভারতের একটি পুরোনো স্যাটেলাইটের ধ্বংসাবশেষের সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘর্ষের ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল বাংলাদেশের প্রথম স্যাটেলাইট বিএস-১-এর। তবে সময়মতো সতর্কবার্তা পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় হিসাব-নিকাশ ও কৌশলগত পদক্ষেপ নিয়ে স্যাটেলাইটটিকে নিরাপদে সরিয়ে নেয় বাংলাদেশ।
গাজীপুরের গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশন থেকে বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেডের (বিএসসিএল) প্রকৌশলীরা পুরো প্রক্রিয়াটি পরিচালনা করেন। তাদের নিখুঁত বিশ্লেষণ ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের কারণে বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়।
বিএসসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুহাম্মদ ইমাদুর রহমান জানান, গত ১৩ আগস্ট ওই মহাকাশ বর্জ্যটি বিএস-১ স্যাটেলাইটের মাত্র ৮৫২ মিটারের মধ্যে চলে এসেছিল।
তিনি বলেন, ধ্বংসাবশেষটি স্যাটেলাইটটির দিকে এগিয়ে আসার বিষয়ে বিএসসিএলের গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশন ৮-৯ আগস্টের দিকে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ নজরদারি ও ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্ম স্পেস-ট্র্যাক থেকে সতর্কবার্তা পায়।
ইমাদুর রহমান জানান, মহাকাশে সবসময় বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য ও পুরোনো স্যাটেলাইটের ধ্বংসাবশেষ ভেসে বেড়ায়। বিএসসিএল স্পেস-ট্র্যাকের সদস্য হওয়ায় কোনো মহাকাশ বর্জ্য তাদের স্যাটেলাইটের জন্য ঝুঁকি তৈরি করলে আগাম তথ্য পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
বিএসসিএলের তথ্য অনুযায়ী, বিএস-১-এর দিকে এগিয়ে আসা ধ্বংসাবশেষটি ছিল ভারতের প্রথম স্যাটেলাইট ইনস্যাট-১এ-এর একটি অংশ। ১৯৮২ সালে উৎক্ষেপণের পর স্যাটেলাইটটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল।
সতর্কবার্তা পাওয়ার পর গাজীপুরের কন্ট্রোল সেন্টারের প্রকৌশলীরা দ্রুত কাজ শুরু করেন। তারা বিএস-১-এর অবস্থান, ধ্বংসাবশেষটির গতিপথ এবং দুই বস্তুর সম্ভাব্য সংঘর্ষের আশঙ্কা নিয়ে বিস্তারিত হিসাব ও বিশ্লেষণ করেন।
ইমাদুর রহমান বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতিতে হিসাব-নিকাশে কোনো ভুলের সুযোগ নেই। ধ্বংসাবশেষটি কখন এবং কতটা কাছ দিয়ে অতিক্রম করবে, সেটি নিশ্চিত হওয়ার জন্য তারা স্পেস-ট্র্যাকের সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন।
পরিস্থিতি বিবেচনায় সংঘর্ষের ঝুঁকি এড়াতে বিএস-১-এর কক্ষপথে সামান্য পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অর্থাৎ স্যাটেলাইটটিকে তার নির্ধারিত অবস্থান থেকে কিছুটা সরিয়ে দেওয়া হয়।
শেষ পর্যন্ত ১৩ আগস্ট ধ্বংসাবশেষটি বিএস-১-এর সবচেয়ে কাছাকাছি পৌঁছায়। তখন এটি বাংলাদেশের স্যাটেলাইটটির মাত্র ৮৫২ মিটার দূর দিয়ে অতিক্রম করে।
বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সহায়তা ছাড়াই সফল অভিযান
এই পুরো কার্যক্রম গাজীপুরের গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশন থেকেই বাংলাদেশের প্রকৌশলীরা পরিচালনা করেন। বিএস-১ নির্মাণকারী ফরাসি প্রতিষ্ঠান থালেসের কোনো সহায়তা ছাড়াই তারা সংঘর্ষের ঝুঁকি মোকাবেলা করতে সক্ষম হন।
ইমাদুর রহমান বলেন, স্যাটেলাইটটি নির্মাণকারী থালেসের কাছ থেকে এ ঘটনায় কোনো সহায়তা নেওয়া হয়নি। বাংলাদেশের প্রকৌশলীরাই পুরো প্রক্রিয়াটি সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন।
থালেস অ্যালেনিয়া স্পেস নির্মিত বিএস-১ ২০১৮ সালের মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়। উৎক্ষেপণের পর প্রথম তিন বছর স্যাটেলাইট পরিচালনায় থালেসের প্রকৌশলীরা সহায়তা করেছিলেন।
তবে ২০২১ সাল থেকে বিএসসিএল স্যাটেলাইটটির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেয়। ইমাদুর জানান, ২০২৪ সাল পর্যন্ত কিছু ক্ষেত্রে সহায়তা নেওয়ার সুযোগ থাকলেও বর্তমানে বিএসসিএল সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে বিএস-১-এর সব কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
এখন গাজীপুরের গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশন থেকেই বাংলাদেশি প্রকৌশলীরা স্যাটেলাইটটির নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনার কাজ করছেন।
বিএস-১-এর জন্য মহাকাশ বর্জ্যের কারণে ঝুঁকি তৈরি হওয়ার ঘটনা এবারই প্রথম নয়। বিএসসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানিয়েছেন, ২০২১ সালেও স্যাটেলাইটটি একই ধরনের সম্ভাব্য সংঘর্ষের ঝুঁকির মুখে পড়েছিল।
মহাকাশে কোনো ধ্বংসাবশেষ বা বর্জ্য কোনো স্যাটেলাইটের কাছাকাছি চলে এলে বিভিন্ন মহাকাশ পর্যবেক্ষণ ও নজরদারি সংস্থা সংশ্লিষ্ট স্যাটেলাইট পরিচালনাকারীদের আগাম সতর্ক করে থাকে। এবারও এমন সতর্কবার্তা পাওয়ার পর দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ায় বিএস-১ বড় ধরনের ঝুঁকি থেকে নিরাপদে বেরিয়ে আসতে পেরেছে।


