আগামী নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হবে: আইনমন্ত্রী
প্রকাশিত হয়েছে : ০৯ জুলাই ২০২৬
দেশ ডেস্ক, ০৯ জুলাই ২০২৬:: আগামী চতুর্দশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হবে বলে জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।
সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর ওপর হাইকোর্টের দেওয়া রায় আপিল বিভাগে বহাল রাখা নিয়ে বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি এ কথা বলেন।
তবে নির্বাচনকালীন এ সরকার কোন প্রক্রিয়ায় এবং কাদের নিয়ে গঠিত হবে, তা রায় দেখলে বোঝা যাবে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলোপসহ বেশকিছু বিষয় পরিবর্তন করে আনা সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে হাইকোর্টের দেওয়া রায় বহাল রেখেছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। এর ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ও গণভোটের অধিকার ফিরলো বলে জানিয়েছেন আইনজীবীরা। বৃহস্পতিবার প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ ও নিয়মিত বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন।
এরপরে যে জাতীয় নির্বাচন হবে, সেই নির্বাচন কি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হবে? এটি কি আপনি নিশ্চিত করে বলতে পারছেন কি না? সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে আইনমন্ত্রী বলেন, ইনশাল্লাহ, ইনশাল্লাহ। এটি আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গীকার। আপনারা জানেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিএনপির আন্দোলনের ফসল। কীভাবে? ৯১ সালে যে নির্বাচন হলো, সেই নির্বাচনের আগে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে যে সংগ্রাম হয়েছিল, সেই সংগ্রামের ফসল ছিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। সেই কনসেপ্ট থেকেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রক্রিয়ায় গিয়েছি।
‘৯৬ সালে বিএনপি পার্লামেন্টে ত্রয়োদশ সংশোধনীর বিল এনেছিল। এনে নির্দলীয়, নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাংগঠনিক রূপরেখা তৈরি করে দিয়েছিল।’
আইনমন্ত্রী আরও বলেন, বিএনপি এটির জন্য বিগত ১৬-১৭ বছর ধরে সংগ্রাম করেছে। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ‘দেশ বাঁচাও মানুষ বাঁচাও’ যে স্লোগান দিয়ে আমরা নিরন্তর সংগ্রামের পথে হেঁটেছিলাম, সেই পথে হাঁটার মুখ্য লক্ষ্য ছিল যে—‘আমার ভোট আমি দেব, যাকে খুশি তাকে দেব’। সেই প্রক্রিয়ায় ফেরার জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিকল্প কোনো পথ ছিল না। আমরা সেই জায়গায় রাজনৈতিকভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ।
রায়ের প্রতিক্রিয়ায় আইনমন্ত্রী বলেন, আপনারা জানেন, সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বেশ কিছু সংশোধনী আনা হয়েছিল। যে সংশোধনীগুলো বাংলাদেশের গণতন্ত্রের কবর রচনা করেছিল। যে সংশোধনীগুলোর মাধ্যমে বাংলাদেশে ফ্যাসিস্টদের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত দেওয়ার জন্য প্রক্রিয়া আনা হয়েছিল, যেগুলো নিয়ে আমরা বলেছিলাম—এটা আল্ট্রা ভাইরাসের মতো কনস্টিটিউশন।
তিনি জানান, হাইকোর্টের রায়ে অবৈধ ঘোষিত সংবিধানের সংশোধনীগুলো বহাল রয়েছে এবং যেসব বিষয়ে সংসদের সিদ্ধান্তের কথা বলা হয়েছে, সেগুলো সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হবে। এক্ষেত্রে ‘জুলাই সনদ’কে মুখ্য বিবেচনায় রেখে জনপরামর্শের ভিত্তিতে সংসদে সংশোধনী বিল আনা হবে।
তিনি বলেন, আমরা সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে যা যা পদক্ষেপ নেওয়া দরকার, আমরা পার্লামেন্টের সামনে প্লেস করবো। সেখানে আমাদের এই সংশোধনীগুলো আনতে মুখ্য বিবেচ্য বিষয় থাকবে ‘জুলাই চার্টার’। জুলাই সনদকে সামনে রেখে মানুষের কল্যাণে, যুগোপযোগী, দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র, আইনের শাসন, মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের জন্য কীভাবে সংশোধনী আনা যায়, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিবেচনা করে এবং পাবলিক কনসালটেশনের মধ্য দিয়েই সংসদে বিল আনবো।
আসাদুজ্জামান জানান, রায় হাতে পাওয়ার পর সংবিধান সংশোধনের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হবে। সেই কমিটি আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে। তবে এ প্রক্রিয়া শেষ হতে কত সময় লাগবে, সে বিষয়ে এখনই নির্দিষ্ট সময়সীমা বলা সম্ভব নয়।
আইনমন্ত্রী আরও বলেন, রায় পাওয়ার পরে আমাদের সংবিধান সংশোধন একটা কমিটি হবে। সেই কমিটির প্রক্রিয়ায়, আইনি প্রক্রিয়ায় যেভাবে আসে সেভাবে আসবে।
তিনি জানান, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহাল করা সরকারের রাজনৈতিক, নির্বাচনি ও জাতীয় অঙ্গীকার। সে অনুযায়ী আগামী নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক বা অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনেই অনুষ্ঠিত হবে।
রায়ে শুধু তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও গণভোট নয়, মোট ৫৪টি বিষয়ে নির্দেশনা রয়েছে। সরকার সবগুলো বিষয়ই পর্যালোচনা করবে এবং জুলাই সনদকে সামনে রেখে প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক পদক্ষেপ নেবে বলেও জানান আইনমন্ত্রী।
তিনি বলেন, রায়ে ৫৪টি বিষয়ে বলা হয়েছে। সবগুলো বিষয়কেই আমরা অ্যাড্রেস করবো এবং জুলাই সনদ আমাদের সেই অ্যাড্রেসিংয়ের ক্ষেত্রে ইনক্লুড হবে। জুলাই সনদ আমাদের সামনে থাকবে।
তিনি জানান, সংসদ যে আইন প্রণয়ন করতে পারে, একইভাবে সাংবিধানিক ক্ষমতাবলে সেই আইন বাতিল করারও ক্ষমতা রাখে। সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের রায়, জুলাই সনদ এবং জনআকাঙ্ক্ষাকে সামনে রেখে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা হবে।
আইনমন্ত্রী জানান, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের বিষয়ে হাইকোর্টের রায়ের আলোকে সংবিধানের প্রয়োজনীয় ধারাগুলো সংশোধন করা হবে। কোথায় সংযোজন, সংশোধন, পরিবর্তন বা পরিমার্জন প্রয়োজন, তা রায় এবং জুলাই সনদ বিবেচনায় নিয়ে নির্ধারণ করা হবে।
তিনি আরও বলেন, হাইকোর্টের রায় অনুসারে যখন আমরা সংশোধনীগুলো আনবো, হাইকোর্টের রায় আমার সামনে থাকবে। যে যে জায়গায় সংস্কার, সংযোজন, সংশোধন, পরিবর্তন বা পরিমার্জন দরকার, সব জায়গায় আমরা রায় এবং জুলাই সনদকে সামনে রেখে জনআকাঙ্ক্ষা পূরণ করে পাবলিক কনসালটেশনের মধ্য দিয়ে আইন পাস করতে চেষ্টা করবো।
তিনি জানান, সুপ্রিম কোর্ট সম্পর্কিত যে কোনো পরিবর্তনের বিষয়ে আদালতের পর্যবেক্ষণ পর্যালোচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। সরকার কোনোভাবেই সুপ্রিম কোর্টের রায় উপেক্ষা করবে না।
যেসব আইন ব্যাপকভাবে জনগণকে প্রভাবিত করবে, সেগুলো প্রণয়নের আগে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত নেওয়া হবে। এজন্য খসড়া আইন প্রকাশ করে নাগরিক সমাজ, বিশেষজ্ঞ, আইনজীবী, ভুক্তভোগী, সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা ও অন্য স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে ধারাবাহিক জনপরামর্শ করা হবে বলেও জানান আইনমন্ত্রী।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, জনপরামর্শের প্রক্রিয়া শেষ করে মানবাধিকার কমিশন আইন আগামী সংসদ অধিবেশনেই উত্থাপনের চেষ্টা করা হবে।

