‘আগুনে পুড়ে নয়, কলকাতার সিস্টেমের জন্য মারা যান ৯ জন’
প্রকাশিত হয়েছে : ২১ আগস্ট ২০২৬
দেশ ডেস্ক, ২১ আগস্ট ২০২৬:: শিখা ইন রেস্টুরেন্টে মারা যাওয়া বাংলাদেশিরা আগুনে পুড়ে নয়, কলকাতার সিস্টেমের জন্য মারা গেছেন। গ্যাসের সঙ্গে কার্বন ভেতরে ঢুকলো আর মারা গেল। একটা ছোট বাচ্চাও ছিল।’
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় কলকাতার নিউমার্কেটের ‘শিখা ইন’ হোটেলের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর পুলিশ ও ব্যবসায়ী সমিতির সঙ্গে বৈঠকে এমন মন্তব্য করেছেন পার্ক স্ট্রিট থানার এক সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তা। ওই এলাকার ‘যমুনা ব্যাংকোয়েটস্’-এ এর আয়োজন করা হয়।
সিনিয়র ওই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘আমি সেদিন ওই হোটেলে ঢুকে দেখলাম; সত্যিই তো কিছুই নেই। আমার খুব কষ্ট হয়েছে। আমি জানি না আপনারা কতজন সেই হোটেলে গিয়েছেন। তবে আমার মনে হলো- ওটা একটা বিশাল হলরুম ছিল। হলটার মধ্যে পার্টিশন করা হলো, মাঝখানে একটা সরু গলির মত। দু’দিকের পার্টিশন করে ছোট ছোট দুটো রুম বার করে দেওয়া হলো, বাথরুম করে দেওয়া হলো।’
তিনি আরও বলেন, ‘যেহেতু ওটা একটা বড় হল। একটাই বেরোনোর রাস্তা। পাশে চারটে রুম বার করা হলো কিন্তু কোথাও একটা ভেন্টিলেটর ছিল না। ঘরে যখন আগুন লেগে গেল। ইন্টেরিয়ার করা হয়েছে কিন্তু ধোয়া বেড়ানোর রাস্তা করা হয়নি। মানুষ বেড়ানোর কথা তো ছেড়ে দিন। এসি চালিয়ে আগুন লাগলো তাহলে এসিও ঘরের গ্যাস বাইরে বার করতে পারছে না। অন্তত বাথরুমে একটা ভালো একজস্ট ফ্যান থাকলে কিছুটা ধোয়া বাইরে বেরিয়ে যেতে পারত। আপনারা একবার নিজেদের হোটেলের বাথরুমগুলো দেখুন। দেখুন, বাথরুমের জানালাটা কত বড় আছে।’
পুলিশের দাবি, সাড়ে চার ঘণ্টা পরে সেই হোটেলের গ্যাস ভেতরেই আবদ্ধ ছিল। তিনি আরও বলেন, ‘সেদিন সাড়ে চার ঘণ্টা পর আমি হোটেলের ভেতরে ঢুকলাম দমকলের কর্মীরা বেরিয়ে যাওয়ার। আমার খারাপ লাগছিল আমি ভেতরে যেতে চাইছিলাম না। রাত দুটো নাগাদ আগুন লেগেছিল আমি সিনিয়র কর্মকর্তাদের নির্দেশে সাড়ে ৬টায় ঢুকেছি। ততক্ষণে দমকল ভেতরের সব ধোয়া বার করে দিয়েছে। তাও ভেতরে গ্যাস। কারণ, একটাই তো দরজা। আপনি ভাবুন, এখানে যদি ধোয়া জড়ো হয় এবং একটাই দরজা থাকে তাহলে ধোঁয়া সহজে বেরোবে না। কিন্তু ভেতর থেকে ভেন্টিলেশন থাকলে সেই সমস্যা থাকে না। ওই ঘরটাতে একটাও জানালা ছিল না বেরোনোর রাস্তাটা ছাড়া।’
এর পরেই তিনি অভিযোগের সুরে বলেন, ‘একটা ছোট টুলের মত জায়গা সেটাই ম্যানেজারের ডেস্ক। তারপরে পার্টিশন করে বাঁদিকে ওয়ান টু ডানদিকে ওয়ান টু। ভাবুন, যে লোকগুলো মারা গেল তারা কিন্তু বেসিক্যালি সিস্টেমের জন্য মারা গেল। আগুনে পুড়ে মরেনি। গ্যাসের সঙ্গে কার্বন ভেতরে ঢুকলো মারা গেল। একটা ছোট বাচ্চাও ছিল। অনেকগুলো মানুষ এখানে এসে এই শহরে এসে আপনার ভরসায় থাকছে। ওদের তো এই শহরে কেউ নেই। ওরা যারা ১০০০/১২০০ টাকায় হোটেলের রুম নিচ্ছে তারা কেউ বিত্তশালী মানুষ নয়। একটা দেশ থেকে অন্য দেশে চলে আসতে শুধুমাত্র আপনাদের ভরসায় থাকছে। তাদের ন্যূনতম নিরাপত্তাটুকু দেওয়ার দায়িত্ব আমাদের।’
এদিন ‘শিখা ইন’ হোটেলের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর পুলিশ ও ব্যবসায়ী সমিতির সঙ্গে বৈঠক করেন পার্ক স্ট্রিট থানার পুলিশ কর্মকর্তারা। সেখানেই একাধিক নির্দেশ দেওয়া হয় পুলিশের তরফে।
এ সময় পার্ক স্ট্রিট থানার ওই আধিকারিক বলেন, ‘আমাদের কষ্ট হয়েছে। আমরা ওখানে রাত তিনটা থেকে দাঁড়িয়েছিলাম তার জন্য নয়। যদি প্রাণগুলো বাঁচাতে পারতাম তাহলে আমরা অনেক খুশি হতাম। ৯টা প্রাণ গেছে। ছোট ব্যাপার না। ন্যাশনাল নিউজের সঙ্গে সঙ্গে ইন্টারন্যাশনাল নিউজ হয়েছে। আমাদের এখান থেকে কিছু শিক্ষা নিতে হবে গভর্নমেন্টের কিছু ইনস্ট্রাকশন আছে, যেটা আমি আজকে বলতে এসেছি।’
এরপরেই তিনি ব্যবসায়ী ব্যবসায়ীদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘পুলিশের নির্দেশ ফায়ার সার্ভিসের লাইসেন্স, ট্রেড লাইসেন্স ও ডিজি অফিস থেকে দেওয়া পুলিশ লাইসেন্স রাখতে হবে। রেস্তোরাঁর জন্য ফুড লাইসেন্স বাধ্যতামূলক। ফায়ার অডিট নিজেরদের খরচে করতে হবে। রাতের বেলা একজন হোটেল স্টাফ বা নাইটগার্ড বাধ্যতামূলক রাখতে হবে যিনি জেগে থাকবেন। রাতেও হোটেলের মূল গেটের দরজা সম্পূর্ণ বন্ধ করা চলবে না। গেস্ট রেজিস্টার বাধ্যতামূলক রাখতে হবে। প্রত্যেকদিনের অতিথিদের যাবতীয় তথ্য ফর্ম বি ও ফর্ম সি’র মাধ্যমে অনলাইনে জমা করতে হবে। নির্দিষ্ট নথি ছাড়া অতিথি রাখা চলবে না এবং ইমার্জেন্সি এক্সিটের সামনে ছোট জায়গায় গাড়ি পার্কিং করা চলবে না। সব হোটেলেই ফায়ার অ্যালার্ম, প্যানিক অ্যালার্ম রাখতে হবে। সব হোটেলকে এই চেষ্টা করতে হবে একটা ইমার্জেন্সি এক্সিট করার।’ সেক্ষেত্রে প্রয়োজনে ইঞ্জিনিয়ারদের সঙ্গে বসার পরামর্শ দেন পুলিশ কর্মকর্তারা।
ব্যাবসায়িক সমিতির ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন পার্ক স্ট্রিট থানার ওসি অমিত চট্টোপাধ্যায়, সিনিয়র অফিসার মহসিন কামালসহ একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা।

