বগুড়ায় তরুণীকে পরিবারের জিম্মায় নিতে আদালত প্রাঙ্গণে তুলকালাম
প্রকাশিত হয়েছে : ২৬ অক্টোবর ২০২৬
দেশ ডেস্ক, ২৬ অক্টোবর ২০২৬:: বগুড়ায় আদালতের কার্যক্রম শেষে প্রাপ্তবয়স্ক এক তরুণীকে জোর করে একটি কালো রঙের হাইস গাড়িতে তোলার চেষ্টার সময় হট্টগোল ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। এ সময় ধস্তাধস্তিতে ওই তরুণীর পোশাক ছিঁড়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
পরে আদালত প্রাঙ্গণে দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তা বগুড়া সদর থানার ওসি ইব্রাহীম আলী ও গোয়েন্দা পুলিশের সদস্যরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে তাকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) দুপুরে বগুড়ার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত চত্বরে এ ঘটনা ঘটে।
জানা গেছে, তাসনিম রানা তামান্না (১৮) নামের ওই তরুণীর এদিন ১৮ বছর পূর্ণ হয়। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের একটি মামলায় তাকে রাজশাহী সেফ হোম থেকে বগুড়ার আদালতে হাজির করা হয়।
এ সময় তার বাবা-মা তাকে নিজেদের জিম্মায় নেওয়ার আবেদন করেন। তবে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় বাবা-মায়ের সঙ্গে যেতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন তামান্না। তার পক্ষে আইনজীবী আদালতে নিজ জিম্মায় যাওয়ার আবেদন জানান।
উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আদমদীঘি থানা আমলি আদালতের বিচারক আবু হেনা সিদ্দিকী তামান্নাকে নিজের জিম্মায় দেওয়ার আদেশ দেন।
আদালতের কার্যক্রম শেষে বের হওয়ার সময় তামান্না আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, আদালত প্রাঙ্গণ থেকে বের হলে তাকে জোর করে নিয়ে যাওয়া হতে পারে। এই পরিস্থিতিতে আদালতের কোর্ট ইন্সপেক্টরকে ডেকে প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। পরে পুলিশি প্রটোকলে কোর্ট ইন্সপেক্টর ও বগুড়া সদর থানার ওসিসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে আদালত ভবন থেকে বের হন তামান্না।
প্রত্যক্ষদর্শী আরিফ জানান, আদালতের ফটক পার হওয়ার পরই তার বাবা-মা ও সঙ্গে থাকা লোকজন তাকে একটি কালো রঙের হাইস গাড়িতে জোর করে তোলার চেষ্টা করেন। এ সময় তামান্না চিৎকার করে তাদের সঙ্গে যেতে অস্বীকৃতি জানান এবং তাকে টানাহেঁচড়া করার একপর্যায়ে তার পরনের পোশাক ছিঁড়ে যায়। পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে উঠলে কোর্ট ইন্সপেক্টর, বগুড়া সদর থানার ওসি ও গোয়েন্দা পুলিশের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে তামান্নাকে নিরাপদে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যান।
সাময়িক বরখাস্ত পুলিশ কনস্টেবল ও তরুণীর বাবা মো. রানা মাসুদ বলেন, আদালতে মেয়ের ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার বিষয়টি নিষ্পত্তির কথা থাকলেও আসামিপক্ষের লোকজন ও আইনজীবীরা তাদের ওপর হামলা চালিয়েছেন। আইন লঙ্ঘন করে তার মেয়েকে ব্ল্যাকমেইল করে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে দাবি করে তিনি এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার ও ওয়ারেন্টভুক্ত আসামিকে দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানান।
তরুণীর সৎ মা মোছা. সুরাইয়া বলেন, আদালতের আদেশের পর বাইরে আসার সময় তারা শুধু মেয়ের হাত ধরতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আসামিপক্ষের লোকজন ও এক আইনজীবী তাদের ওপর চড়াও হন এবং তাকে মারধর করেন। তার দাবি, মেয়েকে অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় পাচার বা খারাপ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার আশঙ্কা রয়েছে, তাই তারা নিরাপত্তার স্বার্থে সন্তানকে নিজেদের জিম্মায় চান।
বগুড়া সদর থানার ওসি ইব্রাহিম আলী জানান, আদালতের আদেশ বাস্তবায়ন, প্রাপ্তবয়স্ক নারীর নিরাপত্তা এবং প্রাঙ্গণের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এই তরণীর যার সঙ্গে বিয়ের কথা বলা হচ্ছে তার বিরুদ্ধে মাসুদ রানা দুইটি অপহরণ মামলা করেছেন। সে মামলার অভিযুক্ত কিশোর সাহেদ বর্তমানে পলাতক রয়েছেন।
প্রসঙ্গত, এর আগে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে ওই তরুণীর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় তার বাবা পুলিশ কনস্টেবল মো. রানা মাসুদ আদমদীঘি থানায় মামলা করেছিলেন। এরপর তামান্না ও সাহেদ হোসেন (২০) নামের এক কিশোর ফেসবুক লাইভে এসে জানান তারা বিয়ে করেছে এবং তাদের যেন খোঁজাখুজি না করা হয়।
এরপর তামান্নার বাবা সাহেদের নামে দুই বার অপহরণ মামলা করেন। এরপর ডিবি পুলিশ তামান্নাকে উদ্ধার করে প্রথমে বাবার হেফাজতে দেয়। এরপর আবারো তামান্না পালিয়ে গেলে পরবর্তীতে তাকে উদ্ধার করে আদালতের মাধ্যমে রাজশাহী সেফ হোমে রাখা হয়। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে ঘটনাটি নিয়ে আইনি লড়াই ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়। ২৬ অক্টোবর বয়স ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার পর আদালতের আদেশে তার ভবিষ্যৎ অবস্থান নির্ধারণের শুনানিকালে এই নতুন উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।


