সিলেটে ‘মবের ভয়ে’ বইমেলা বাতিলে ১৫০ বিশিষ্টজনের উদ্বেগ
প্রকাশিত হয়েছে : ২৫ এপ্রিল ২০২৬
দেশ ডেস্ক:: সিলেটে ‘মবের ভয়ে’ প্রকাশক পরিষদের বইমেলা বাতিল করায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ১৫০ জন লেখক, সংগঠকসহ বিভিন্ন পেশার বিশিষ্টজন।
যৌথ বিবৃতিতে তারা বলেন, ‘আমরা গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করছি, ২৪ এপ্রিল সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে প্রকাশক পরিষদ, সিলেটের উদ্যোগে অনুষ্ঠিতব্য বইমেলা উদ্বোধনের আগের দিন বাতিল করা হয়েছে। অথচ এ সিদ্ধান্তের পক্ষে কোনো সুনির্দিষ্ট ও গ্রহণযোগ্য কারণ উপস্থাপন করা হয়নি। এর পেছনে কারা এবং কী উদ্দেশ্যে প্রভাব বিস্তার করেছেন, তা এখনও অস্পষ্ট।’
শনিবার (২৫ এপ্রিল) প্রকাশক পরিষদ, সিলেটের মাধ্যমে বিবৃতিটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি আকারে গণমাধ্যমে দেওয়া হয়। প্রকাশক পরিষদের সভাপতি নাজমুল হক যৌথ বিবৃতির বিষয়টি নিশ্চিত করে খবরের কাগজকে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার আমলে বইমেলাটি বাতিল করা হয়েছিল। তখন পরিস্থিতির কারণে আমরা মেনে নিয়েছিলাম। এখন নির্বাচিত সরকার আমলে একই পন্থা অবলম্বন করায় দেশে ও বিদেশে থাকা লেখক-সাংস্কৃতিক সংগঠকসহ বিশিষ্টজনেরা ক্ষুব্ধ হয়েছেন। তাদের প্রতিক্রিয়ায় যৌথ বিবৃতিটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি হিসেবে প্রকাশ করা হয়েছে।’
বিবৃতিতে বলা হয়, ‘ট্রেড লাইসেন্সধারী প্রকাশকদের সমন্বয়ে গঠিত একটি পেশাভিত্তিক সংগঠন-যারা নিজেদের অর্থ, শ্রম ও দায়বদ্ধতায় একটি অঞ্চলের সাহিত্য-সংস্কৃতিকে এগিয়ে নিতে কাজ করছে তাদের কার্যক্রমকে বারবার বাধাগ্রস্ত করা কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি একটি সংকীর্ণ ও অবিশ্বাসপ্রসূত মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ। যদি অভিযোগের ভিত্তি হয় ‘কে কোন সময়ে কার সঙ্গে ছবি তুলেছে’, ‘কে কাকে চিনত’ কিংবা ‘অতীতে কার সঙ্গে কার যোগাযোগ ছিল’ তবে প্রশ্ন জাগে: আমরা কি আইনের শাসনে পরিচালিত হচ্ছি, নাকি অনুমান, অপপ্রচার ও সন্দেহের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিচ্ছি?’
বইমেলা বাতিলের সিদ্ধান্তকে সাহিত্য-সংস্কৃতির স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করা উল্লেখ করে বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘একটি বইমেলা কেবল বাণিজ্যিক আয়োজন নয়; এটি পাঠক, লেখক ও প্রকাশকদের মিলনস্থল একটি অঞ্চলের সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের প্রকাশভূমি। সেখানে রাজনৈতিক সন্দেহ বা বিরোধ প্রবেশ করিয়ে এমন আয়োজন ব্যাহত করা মানে সাহিত্য-সংস্কৃতির স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করা। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো যেখানে সংশ্লিষ্ট সংগঠনের বিরুদ্ধে কোনও ফৌজদারি অভিযোগ নেই এবং সহিংসতার কোনও ইতিহাস নেই, সেখানে ‘নিরাপত্তাহীনতা’কে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এ ধরনের প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে কোনও স্বাধীন সাংস্কৃতিক উদ্যোগই নিরাপদ থাকবে না। প্রশ্নটি এখন স্পষ্ট: বইমেলার মতো সাংস্কৃতিক আয়োজন কি প্রকাশক ও সংস্কৃতিকর্মীরা পরিচালনা করবেন, নাকি অনুমাননির্ভর অভিযোগের ভিত্তিতে কিছু ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নির্ধারণ করবে কারা সংস্কৃতি চর্চা করতে পারবে?’
এ অবস্থায় লেখক-প্রকাশক-সংস্কৃতিকর্মীদের ঐক্যের আহ্বান জানিয়ে বলা হয়, ‘আমরা মনে করি, এ ধরনের বাধা সমাজের জন্য কোনও ইতিবাচক বার্তা বহন করে না। বরং এটি সৃজনশীলতাকে দমিয়ে দেয়, বিভাজনকে উসকে দেয় এবং আমাদের সাংস্কৃতিক ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তোলে। অতএব, বইমেলার মতো সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা এবং এ ধরনের হয়রানি ও বাধা বন্ধে প্রশাসনের দায়িত্বশীল ভূমিকা নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছি। একইসঙ্গে, সকল লেখক, প্রকাশক ও সংস্কৃতিকর্মীদের প্রতি এই পরিস্থিতিতে সুস্পষ্ট ও সক্রিয় অবস্থান গ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছি।’
বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী ১৫০ জনের মধ্যে রয়েছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ড. জিয়াউদ্দিন আহমদ, ড. ইবরুল চৌধুরী, অধ্যাপক খায়ের মোহাম্মদ মিঞা, ডা. ফাতেমা আহমেদ, কবি ও সাহিত্য সংগঠক এ কে শেরাম, উত্তর আমেরিকা প্রথম আলো সম্পাদক ইব্রাহিম চৌধুরী, কথাসাহিত্যিক আকমল হোসেন নিপু, মুক্তিযুদ্ধ গবেষক তাজুল মোহাম্মদ, কবি ও গবেষক মোস্তাক আহমাদ দীন, লেখক ও সংস্কৃতিকর্মী মাহবুব লীলেন, টি এম কায়সার, কবি ফকির ইলিয়াস, ফজলুর রহমান বাবুল, আইনজীবী সৈয়দ মনির হেলাল, কবি ও ভ্রমণআখ্যানকার আবিদ ফায়সাল, হোসনে আরা কামালী, সাঈম চৌধুরী, মুহাম্মদ শাহেদ রাহমান, লেখক ও অনুবাদক মিহিরকান্তি চৌধুরী, গীতিকার শাহ নূরজালাল, কবি সজল ছত্রী, লোকসংস্কৃতি গবেষক সজল কান্তি সরকার, মানবাধিকারকর্মী শেখর মোহান্ত, বিজ্ঞান লেখক অনন্ত নিগার প্রমুখ।

