স্কটিশ পার্লামেন্ট নির্বাচনে লেবারের মনোনয়ন পেলেন গোলাপগঞ্জের আফিফা খানম
প্রকাশিত হয়েছে : ০৯ মার্চ ২০২৬
মিজান রহমান, এডিনবরা:: স্কটল্যান্ডের রাজনীতিতে ইতিহাস গড়তে যাচ্ছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত শিক্ষাবিদ ও কমিউনিটি নেত্রী আফিফা খানম। প্রথমবারের মতো কোনো বাংলাদেশি নারী হিসেবে তিনি আগামী মে মাসে অনুষ্ঠিতব্য স্কটিশ পার্লামেন্ট নির্বাচনে এমএসপি প্রার্থী হিসেবে লেবার পার্টির মনোনয়ন পেয়েছেন। মিড ফাইফ ও গ্লেনরথিস আসন থেকে তাঁর প্রার্থিতাকে প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য গর্বের মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আফিফা খানম পেশায় একজন হাইস্কুল শিক্ষক। তিনি গ্লেনরথিস হাইস্কুলের সাবেক প্রিন্সিপাল টিচার এবং কমিউনিটি স্কুল অব অকটার্ডারের ডেপুটি হেডটিচার ও বিজনেস ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি শিক্ষকতার পাশাপাশি মানবাধিকার, সমতা প্রতিষ্ঠা, সমাজসেবা ও কমিউনিটি উন্নয়নমূলক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে সক্রিয়। অন্তর্ভুক্তিমূলক নেতৃত্বের জন্য তিনি স্কটল্যান্ডের শিক্ষা অঙ্গনে সুপরিচিত।
পেশাগত ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি তিনি একজন কবি, পাবলিক স্পিকার, কোচ এবং আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা বিশেষজ্ঞ। তিনি ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের সঙ্গেও যুক্ত এবং বাংলাদেশ ও স্কটল্যান্ডে পরিচালিত বিভিন্ন মানবিক ও চ্যারিটেবল উদ্যোগের প্রতিষ্ঠাতা।
আফিফা খানমের জন্ম সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার ঢাকা দক্ষিণ ইউনিয়নের বারকোট গ্রামে। তাঁর বাবা আব্দুল কুদ্দুছ ছিলেন অ্যাসিস্ট্যান্ট পোস্টমাস্টার জেনারেল এবং মা সৈয়দা নেহার বেগম গৃহিণী। চার ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়।
বারকোট প্রাইমারি স্কুলে তাঁর শিক্ষাজীবনের শুরু। পরে ঢাকা দক্ষিণ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। বিবাহের পর ১৯৮২ সালে তিনি স্কটল্যান্ডে পাড়ি জমান। নতুন দেশ ও ভাষাগত চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করে তিনি ধীরে ধীরে শিক্ষা ও সামাজিক ক্ষেত্রে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
স্কটল্যান্ডে গিয়ে তিনি প্রথমে স্থানীয় কাউন্সিলের ইএসওএল (ইংলিশ ফর স্পিকার্স অব আদার ল্যাঙ্গুয়েজেস) ও কমিউনিটি অ্যাডাল্ট লার্নিং ক্লাসে পড়াশোনা শুরু করেন। পরে ক্ল্যাকম্যান কলেজে অধ্যয়ন করেন এবং ইউনিভার্সিটি অব স্টার্লিং থেকে স্নাতক (বিএ) ডিগ্রি অর্জন করেন। শিক্ষা বিষয়ে ডিপ্লোমা সম্পন্ন করে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এডুকেশনাল লিডারশিপে এমএসসি ডিগ্রি লাভ করেন। পাশাপাশি স্কটিশ কোয়ালিফিকেশন অথরিটি থেকে উচ্চতর হেডশিপ অ্যাওয়ার্ড ও অ্যাডাল্ট লার্নার অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেন।
কমিউনিটি উন্নয়ন ও স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজেও তিনি দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত। নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে স্কটল্যান্ডে তিনি ‘ইন্টারন্যাশনাল উইমেন গ্রুপ’ প্রতিষ্ঠা করেন এবং কমিউনিটি লাইফ স্কিল কর্মসূচির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।
২০১৮ সাল থেকে তিনি গ্লেনরথিসভিত্তিক চ্যারিটি প্রতিষ্ঠান ‘লেইটার লাইফ চয়েস’-এর বোর্ড পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রতিষ্ঠানটি বয়স্ক মানুষের কল্যাণ ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তি নিয়ে কাজ করে।
শিক্ষাক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহযোগিতাতেও তাঁর ভূমিকা রয়েছে। ব্রিটিশ কাউন্সিলের ‘কানেক্টিং ক্লাসরুম’ প্রকল্পের মাধ্যমে স্কটল্যান্ড ও বাংলাদেশের বিভিন্ন স্কুলের মধ্যে শিক্ষা বিনিময় কর্মসূচি গড়ে তুলতে তিনি কাজ করেছেন।
২০১২ সাল থেকে তিনি স্কটিশ শিক্ষকদের ট্রেড ইউনিয়ন এনএএসইউডব্লিউটি-এর সক্রিয় সদস্য। সেখানে তিনি ওয়ার্কপ্লেস প্রতিনিধি, হেলথ অ্যান্ড সেফটি অফিসার ও ইকুয়ালিটি অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি স্কটিশ ট্রেড ইউনিয়ন কাউন্সিলের ব্ল্যাক ওয়ার্কার কমিটির সদস্য।
পেশাগত উৎকর্ষতা ও কমিউনিটিতে অবদানের জন্য তিনি বিভিন্ন সম্মাননা পেয়েছেন। ২০২৫ সালের ৩ ডিসেম্বর স্কটিশ পার্লামেন্টে অনুষ্ঠিত স্কটিশ পাবলিক সার্ভিস অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে তিনি ‘দ্য লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করেন। এছাড়া সম্প্রতি সিলেট জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ‘প্রবাসী সম্মাননা অ্যাওয়ার্ড’-এ ভূষিত হন।
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই তিনি লেবার পার্টির সমর্থক। ২০১৮ সালে ক্ল্যাকম্যানশায়ার কাউন্সিলের উপনির্বাচনে লেবার পার্টির কাউন্সিলর প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। বর্তমানে মিড ফাইফ ও গ্লেনরথিস লেবার পার্টির সিএলপি কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
নির্বাচিত হলে শিক্ষাক্ষেত্রে উন্নয়নে কাজ করার অঙ্গীকার করেছেন আফিফা খানম। তাঁর ভাষ্য, স্কটল্যান্ডে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়লেও শিক্ষার সুযোগ ও সহায়তা কমছে, ফলে শিক্ষকদের ওপর চাপ বাড়ছে। প্রতিটি শিশুর মানসম্মত শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি।
তিনি তাঁর এলাকায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর পাশাপাশি দারিদ্র্য কমানো, জীবনযাত্রার ব্যয় মোকাবিলা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, যাতায়াত ব্যবস্থা ও স্থানীয় অবকাঠামো উন্নয়নকে নির্বাচনী অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
ইমিগ্রেশন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, স্কটল্যান্ডে বয়স্ক জনসংখ্যা বাড়ছে এবং কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমছে। তাই পরিকল্পিত মাইগ্রেশন প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
নির্বাচনী প্রচারণার সময় বর্ণবাদী আচরণের শিকার হওয়ার কথাও সামাজিক মাধ্যমে জানিয়েছেন আফিফা খানম। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, স্কটিশ সমাজে বর্ণবাদের কোনো স্থান নেই। এ ধরনের আচরণ তাঁকে দমিয়ে রাখতে পারবে না।
মিড ফাইফ ও গ্লেনরথিস সেন্ট্রাল ইস্ট স্কটল্যান্ড অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ আসন। রাজধানী এডিনবরার প্রায় ৩২ মাইল উত্তরে অবস্থিত এই আসনে প্রায় ৫৫ হাজারের বেশি নিবন্ধিত ভোটার রয়েছেন। বর্তমানে আসনটির এমএসপি হলেন জেনি গিলরুথ। আসন্ন নির্বাচনে এটি একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
আফিফা খানমের তিন মেয়ে ও এক ছেলে রয়েছে। তাঁরা সবাই উচ্চশিক্ষিত এবং বিভিন্ন পেশায় কর্মরত। তিনি সপরিবারে ফাইফ কাউন্সিলের গ্লেনরথিস শহরে বসবাস করছেন।
প্রথমবারের মতো একজন বাংলাদেশি নারী হিসেবে স্কটিশ পার্লামেন্ট নির্বাচনে তাঁর মনোনয়নকে স্কটল্যান্ডে বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য গৌরবজনক অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে। আফিফা খানম বলেন, যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশি নারীরা এগিয়ে থাকলেও স্কটল্যান্ডে পরিবার ও কমিউনিটির সহায়তা পেলে তারাও রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবেন। মূলধারার রাজনীতিতে অংশ নেওয়ার জন্য তিনি সবার প্রতি আহ্বান জানান। সংবাদ বিজ্ঞপ্তি

