বাংলাদেশে আটক সাংবাদিকদের অবিলম্বে মুক্তির দাবি যুক্তরাজ্যের সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মীদের
প্রকাশিত হয়েছে : ৩০ মে ২০২৬
লন্ডনে অনুষ্ঠিত “মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের জন্য গণমাধ্যমের স্বাধীনতা” শীর্ষক এক আলোচনা সভায় যুক্তরাজ্যভিত্তিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী এবং পেশাজীবীরা বাংলাদেশে গণমাধ্যমের ওপর চলমান দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তারা অবিলম্বে ও বিনাশর্তে কারাবন্দী সাংবাদিকদের মুক্তি এবং সংবাদপত্র ও সাংবাদিকদের ওপর সব ধরনের নির্যাতন বন্ধের জন্য বর্তমান বিএনপি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
গত ২১ মে বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত এই সভায় বক্তারা মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে গণমাধ্যম দমন এবং গণতান্ত্রিক ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের তীব্র নিন্দা জানান। তারা গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বাংলাদেশে সাংবাদিকদের ওপর এই নির্যাতন আজও অব্যাহত রয়েছে। সভায় বক্তারা মিথ্যা মামলায় মাসের পর মাস বন্দী ও নির্যাতনের শিকার সাংবাদিক এবং তাদের পরিবারের প্রতি গভীর সংহতি প্রকাশ করেন।
একই সঙ্গে বক্তারা সতর্ক করে বলেন, সাংবাদিকদের কারাগারে রেখে এবং তাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করে বিএনপি সরকার ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের আগে দেওয়া তাদের গণতান্ত্রিক প্রতিশ্রুতি চরমভাবে লঙ্ঘন করছে।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন যুক্তরাজ্যের প্রবীণ সাংবাদিক উইলিয়াম হর্সলি। তিনি ৩৫ বছরেরও বেশি সময় বিবিসিতে কাজ করেছেন এবং বর্তমানে কমনওয়েলথ জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশনের কার্যনির্বাহী কমিটিসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা রক্ষায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
বর্তমান প্রশাসনের কঠোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, “২০২৪ সালের অস্থিরতার পর সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও মনগড়া অভিযোগে গ্রেপ্তারের ১৮ মাস পরও শ্যামল দত্ত, মোজাম্মেল হক বাবু, ফারজানা রূপা এবং শাকিল আহমেদের মতো দেশের সুপরিচিত ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের আটকে রাখা এবং তাদের মৌলিক অধিকার অস্বীকার করা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। এই সাংবাদিকদের মুক্তি এবং তাদের বিরুদ্ধে আনা ভিত্তিহীন অভিযোগ প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত বর্তমান সরকার গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে জিম্মি করার এবং গত ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের দায় থেকে মুক্ত হতে পারবে না।”
ব্রিটেনের অন্যতম জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক এবং বিবিসি এশিয়ার সাবেক প্রধান রীতা পেইনও বাংলাদেশে সাংবাদিকদের চলমান আটক ও নিপীড়ন নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। কমনওয়েলথ জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশন (যুক্তরাজ্য)-এর নির্বাহী সদস্য পেইন নোবেল শান্তি পুরস্কারপ্রাপ্ত অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সাংবাদিকদের সুরক্ষা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষায় ব্যর্থতার তীব্র সমালোচনা করেন।

বিশিষ্ট আইনজীবী ব্যারিস্টার তানিয়া আমীর তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশের গণমাধ্যম আইন এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর একটি বিশ্লেষণধর্মী পর্যালোচনা উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, “সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতন ও তাদের জেলে আটক রাখা কোনো বিচ্ছিন্ন আইনি ঘটনা নয়; বরং এটি ভিন্নমত, স্বাধীন চিন্তা এবং স্বাধীন মতপ্রকাশের অধিকার স্তব্ধ করার একটি সুসংগঠিত প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়াস, যার উদ্দেশ্য ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহিতা থেকে রক্ষা করা। আইনের শাসন ও স্বাধীন বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত না হলে কেবল সরকার পরিবর্তনে এই নিপীড়ন বন্ধ হবে না।”
কমনওয়েলথ জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য ও বিশিষ্ট সাংবাদিক সৈয়দ বদরুল আহসান বলেন, ২০২৪ সালের অস্থিরতার পর বাংলাদেশ একটি অবৈধ শাসনের অধীনে পরিচালিত হয়েছে, যা দেশটির ইতিহাস, ঐতিহ্য ও প্রতীকগুলোকে পদ্ধতিগতভাবে ধ্বংস করেছে। আটক সহকর্মীদের মুক্তির দাবি না তোলা এবং নীরব থাকার জন্য তিনি বাংলাদেশে সাংবাদিক সংগঠনগুলোর বর্তমান নেতৃত্বের কঠোর সমালোচনা করেন। এ পরিস্থিতিতে তিনি বাংলাদেশ ও প্রবাসের সব সাংবাদিক এবং মানবাধিকারকর্মীদের আটক সাংবাদিকদের মুক্তির দাবিতে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান।
যুক্তরাজ্যের প্রাচীনতম বাংলা সংবাদপত্র ‘জনমত’-এর সম্পাদক এবং কমনওয়েলথ জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট সৈয়দ নাহাস পাশা কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ছাড়াই সাজানো মামলায় আটক সকল সাংবাদিকের নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানান।
নিউ ইয়র্ক থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি ফারিদা ইয়াসমিন অভিযোগ করেন, অন্তর্বর্তী সরকার সাংবাদিকদের অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড বাতিল, ব্যাংক হিসাব জব্দ এবং শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের মাধ্যমে গণমাধ্যমকে স্তব্ধ করার চেষ্টা করেছে।
অনুষ্ঠানের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্ত ছিল অস্ট্রেলিয়া থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হওয়া প্রবীণ সাংবাদিক শ্যামল দত্তের কন্যা সুশমা শশী দত্তের বক্তব্য। তিনি অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে জানান, তাঁর বাবা ৬০০ দিনেরও বেশি সময় ধরে বিনা বিচারে আটক রয়েছেন। তিনি বর্তমানে গুরুতর ও জীবনের হুমকিস্বরূপ বিভিন্ন জটিল রোগে ভুগছেন এবং কারাগারে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও জীবনরক্ষাকারী ওষুধ থেকে বঞ্চিত রয়েছেন।
লন্ডন-বাংলা প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মো. আকরামুল হোসেন বলেন, বাংলাদেশের সাংবাদিকরা বহু বছর ধরে নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হলেও পরিস্থিতি এখন আরও জটিল ও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা দিন দিন বেড়েই চলেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সভায় সমাপনী ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন বাংলাদেশের সাবেক মন্ত্রী এবং ‘প্রোটেক্ট বাংলাদেশ’-এর প্রধান উপদেষ্টা শফিকুর রহমান চৌধুরী। তিনি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই মানবিক সংকট তুলে ধরার আহ্বান জানিয়ে বলেন, বর্তমান সরকার যদি গণতন্ত্রের প্রতি বিন্দুমাত্র দায়বদ্ধতা দেখাতে চায়, তবে এসব দাবি অবিলম্বে মেনে নিতে হবে।
আলোচনা সভাটি যৌথভাবে আয়োজন করে যুক্তরাজ্যভিত্তিক অ্যাডভোকেসি প্ল্যাটফর্ম ‘প্রোটেক্ট বাংলাদেশ’। অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের হাইকমিশনের সাবেক প্রেস মিনিস্টার ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আশেকুন নবী চৌধুরী। এ আয়োজনের মিডিয়া পার্টনার ছিল লন্ডনভিত্তিক টেলিভিশন চ্যানেল ‘আইমিডিয়া’ এবং স্ট্রিমিং পার্টনার ছিল ‘ব্রিজ বাংলা’।
অনুষ্ঠানে যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত সাংবাদিক, আইনজীবী, শিক্ষাবিদ, মানবাধিকারকর্মী, ব্যবসায়ী এবং বাংলাদেশি ও অন্যান্য প্রবাসী সম্প্রদায়ের বিপুলসংখ্যক সদস্য অংশ নেন। উপস্থিত অতিথিদের মধ্যে ছিলেন নিউ ডন ইনিশিয়েটিভ (এনডিআই)-এর সভাপতি মুহাম্মদ হরমুজ আলী ও সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার মাসুদ আকতার, সনাতন অ্যাসোসিয়েশন ইউকের সেক্রেটারি রবিন পাল, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি ইউকের সভাপতি সৈয়দ এনাম, কমিউনিটি ব্যক্তিত্ব ও উদ্যোক্তা সৈয়দ এহসান, কমিউনিটি সংগঠক ও ব্যবসায়ী এএসএম মিসবাহ ও মোহাম্মদ আলী মজনু, স্মল ড্রপস প্রতিষ্ঠাতা বালানন্থিনি (নেলা) বালাসুব্রামানিয়াম, সাংবাদিক হামশিকা কৃষ্ণমূর্তি, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আনসার আহমেদ উল্লাহ, হামিদ মাহমুদ, সরওয়ার কবির, সয়েব কবির, আফজাল হুসেইন ও শাহ এম. রহমান বেলাল, লেখক আজিজুল আম্বিয়া এবং চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট সেলিম আহমেদ।

