প্রতিষ্ঠার ৫০ বছর পূর্ণ করছে ব্রিকলেইন জামে মসজিদ : সেপ্টেম্বরে দু’দিনব্যাপী আয়োজন
প্রকাশিত হয়েছে : ০১ আগস্ট ২০২৬
দেশ, লন্ডন, ০১ আগস্ট ২০২৬:: যুক্তরাজ্যের ঐতিহাসিক ব্রিক লেইন জামে মসজিদের প্রতিষ্ঠার ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে । শুক্রবার (৩১ জুলাই) আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে মসজিদের গৌরবময় ইতিহাস, দীর্ঘ পথচলা, বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড এবং সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের বিস্তারিত কর্মসূচি তুলে ধরে সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন পরিষদ।
একই সঙ্গে আগামী ৫ ও ৬ সেপ্টেম্বর দুই দিনব্যাপী ৫০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠান সফল করতে কমিউনিটির সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতা কামনা করা হয়। অনুষ্ঠানে দেশ-বিদেশের অতিথি, আলেম-উলামা, কমিউনিটি নেতৃবৃন্দ এবং সর্বস্তরের মুসল্লিদের অংশগ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন পরিষদের আহ্বায়ক, ব্রিকলেন মসজিদ কমিটির সহ-সভাপতি মোহাম্মদ হরমুজ আলী। এসময় মসজিদের সভাপতি আতাউর রহমান চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক হেলাল উদ্দিন আলীসহ কমিউনিটির বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। শুরুতে পবিত্র কুরআন থেকে তেলাওয়াত করেন মসজিদের ইমাম ও মোয়াজ্জিন হাফিজ সাজ্জাদুর রহমান। দোয়া পরিচালনা করেন মসজিদের প্রধান ইমাম ও খতীব মাওলানা নজরুল ইসলাম।
লিখিত বক্তব্যে হরমুজ আলী বলেন, দুই শতাব্দীরও অধিক সময় ধরে ব্রিক লেইন জামে মসজিদের ভবনটি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ধর্মীয় উপাসনালয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ১৭৪৩ সালে এটি একটি ফরাসি প্রোটেস্ট্যান্ট গির্জা হিসেবে নির্মিত হয়। পরে এটি মেথডিস্ট চ্যাপেল হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং ১৮৯৮ সালে ইহুদি অধ্যুষিত এলাকায় একটি সিনাগগ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। পরবর্তীতে ১৯৭৬ সালে ভবনটি মসজিদে রূপান্তরিত হয়। প্রায় ২৪০ বছরের পুরোনো এ ঐতিহাসিক ভবনের বেইসমেন্ট একসময় বাণিজ্যিক গুদামঘর হিসেবে ব্যবহৃত হলেও বর্তমানে সেখানে মহিলাদের নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ২০০৬ সালের ৩০ জানুয়ারি বহুল প্রত্যাশিত মিনার নির্মাণের কাজ শুরু হয়। ইংলিশ হেরিটেজের মতামতের ভিত্তিতে টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিল ওই দিনই মিনার নির্মাণ পরিকল্পনা অনুমোদন করে। টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিল ও বিশপ গেট রিজিওনালের অর্থায়নে নির্মিত মিনারটি ২০১০ সালের জানুয়ারিতে সম্পন্ন হয় । বর্তমানে এটি পূর্ব লন্ডনের অন্যতম দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্য হিসেবে পরিচিত। বর্তমানে যেখানে মুসল্লিরা নামাজ আদায় করেন, সেই ভবনটি অতীতে গির্জা এবং পরে বিখ্যাত সিনাগগ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। ১৯৫০ সালে ভবনটি গ্রেট লন্ডন হাউজিং হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়। ফলে ভবনটির মেরামত, পরিবর্তন কিংবা পরিবর্ধনের ক্ষেত্রে কঠোর শর্ত অনুসরণ করতে হয়। ১৯৭৬ সালে মসজিদে রূপান্তরের পর মূল কাঠামো অপরিবর্তিত রেখে অভ্যন্তরীণ কক্ষগুলোর ব্যাপক সংস্কার করা হয়েছে। এ কাজে মসজিদের বিগত পরিচালনা পরিষদ থেকে শুরু করে বর্তমান পরিচালনা পরিষদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে মসজিদ প্রতিষ্ঠায় যেসব মুরব্বি ও মুসল্লি অক্লান্ত পরিশ্রম ও আর্থিক সহযোগিতা করেছেন, তাঁদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন আলহাজ্ব তছফুল ইসলাম, আলহাজ্ব মতলব চৌধুরী, আলহাজ্ব তৈয়বুর রহমান, আলহাজ্ব মোবারক আলী, আলহাজ্ব কারী এ. গনি, আলহাজ্ব এ. মতিন, আলহাজ্ব এ. মামুন, আলহাজ্ব রইমান, আলহাজ্ব মাসুদ আলী, আলহাজ্ব উসমান আলী, মোহাম্মদ আব্দুল গফুর বি.এ.বি.টি, আলহাজ্ব শামসুল হক, আলহাজ্ব আব্দুর রবিক, আলহাজ্ব মতিউর রহমান চৌধুরী, মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ, আলহাজ্ব আব্দুল মুকিত, আলহাজ্ব গোলাম মোস্তফা, আলহাজ্ব জিন্নুল হক, আলহাজ্ব আতাউর রহমান চৌধুরী, আলহাজ্ব আব্দুল মুকিত, আলহাজ্ব সাজ্জাদ মিয়া, মোহাম্মদ আব্দুল কাদির, মোহাম্মদ আমান আলী, হাজী মেওত্রী মিয়া এবং মৌলভী আব্দুল আলী । তাঁদের অনেকেই বিভিন্ন সময়ে মসজিদের পরিচালনা পরিষদের দায়িত্ব পালন করেছেন।
এতে উল্লেখ করা হয়, প্রতি দুই বছর পরপর মসজিদ পরিচালনা কমিটির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তিন থেকে চার হাজার মুসল্লি এখানে নামাজ আদায় করেন। শিশু-কিশোরদের জন্য হাফিজি ও ধর্মীয় শিক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। চারটি শ্রেণিকক্ষে প্রায় ৫০ জন ছাত্রছাত্রী বিভিন্ন বিভাগে অধ্যয়ন করছে। সরকারি কোনো অনুদান ছাড়াই মুসল্লিদের দান-অনুদানের মাধ্যমে মসজিদের সব কার্যক্রম পরিচালিত হয়। তিনতলা ভবনে ২০টির বেশি কক্ষ রয়েছে এবং বর্তমানে ভবনটির মূল্য প্রায় ২০ লাখ পাউন্ড বলে জানানো হয়। মুসল্লিদের সুবিধার্থে ঈদ ও শুক্রবার জুমার নামাজের সময় মসজিদের আশপাশে বিনামূল্যে পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। দেশি-বিদেশি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি, বিভিন্ন প্রশাসনিক কর্মকর্তা, ইংল্যান্ড ও আমেরিকার স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও নিয়মিত এই ঐতিহাসিক মসজিদ পরিদর্শনে আসেন।
সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, বিভিন্ন সময়ে রাজা তৃতীয় চার্লস, কুইন কনসোর্ট ক্যামিলা, হাউজ অব কমন্সের চেয়ারম্যান, ডেপুটি চেয়ারম্যান, বরিস জনসন, সাবেক ডেপুটি প্রধানমন্ত্রী মাইকেল হেজেলটাইন, লর্ড এভরি, লন্ডনের সাবেক মেয়র কেন লিভিংস্টোন, বর্তমান মেয়র সাদিক খান, ডেপুটি মেয়র রিচার্ড বার্নস, পুলিশের ভারপ্রাপ্ত সুপারিনটেনডেন্ট বরাট রেজলো, ব্রিটিশ হাই কমিশনার থমাস ইউডাল, বাংলাদেশের তৎকালীন জেনারেল এম.এ.জি. ওসমানী, সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদ, সাবেক স্পিকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ফখরুদ্দীন আহমদ, সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, সৈয়দ আব্দুল হালিম, কুয়েতের শেখ ইউসুফ রেফায়ী এবং মিশরের আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শেখ আবু নাসরাসহ অসংখ্য বিশিষ্ট ব্যক্তি মসজিদটি পরিদর্শন করেছেন। পরিচালনা পরিষদ এলাকার মুসল্লিদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত মিনার নির্মাণের পাশাপাশি মসজিদ ও মাদ্রাসার ব্যাপক উন্নয়ন ও সংস্কার কাজ সম্পন্ন করেছে। একই সঙ্গে মসজিদের ফিউনারেল সার্ভিসও চালু করা হয়েছে। মুসল্লিদের সহযোগিতায় আল্লাহর ঘরের খেদমত অব্যাহত রয়েছে। এ জন্য পরিচালনা পরিষদ সকলের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।

