যুক্তরাজ্যে আমার ট্যাক্সের অর্থ কোথায় যায়?
প্রকাশিত হয়েছে : ০৬ অক্টোবর ২০২৬
মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান
বয়স চল্লিশ পার করেছি কয়েক বছর আগে। ইংল্যান্ডে ৪০ থেকে ৭৪ বছর বয়সী ব্যক্তিদের সাধারণত পাঁচ বছর পরপর বিনা খরচে এনএইচএস থেকে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। উদ্দেশ্য হলো হৃদ্রোগ, স্ট্রোক, ডায়াবেটিস ও কিডনি রোগের মতো অসুস্থতার ঝুঁকি আগেভাগে শনাক্ত করা।
আমার জিপি (জেনারেল প্রাকটিশনার) থেকেও এর আগে কয়েকবার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানোর জন্য ম্যাসেজ এসেছে। সত্যি বলতে, সেগুলো খুব একটা গুরুত্ব দিয়ে দেখিনি। নিজেকে মোটামুটি সুস্থ মনে হতো। তাই ভাবতাম, যখন শরীরে তেমন কোনো সমস্যা অনুভব করছি না, তখন পরীক্ষা-নিরীক্ষারই বা কী প্রয়োজন? কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চিন্তাও বদলায়। সম্প্রতি মনে হলো, চল্লিশের কোঠা পেরিয়ে এসেছি; অন্তত কিছু মৌলিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো উচিত।
এবার জিপি থেকে আসা ম্যাসেজের জবাব দিলাম। প্রথমে সাধারণ স্বাস্থ্য পরীক্ষা হলো। এরপর রক্ত পরীক্ষা করা হলো। আমার আগের অভিজ্ঞতা থেকে ধারণা ছিল, জিপিতে কোনো পরীক্ষা করার পর গুরুতর বা অস্বাভাবিক কিছু পাওয়া গেলে সাধারণত রোগীকে জানানো হয় । আর সবকিছু স্বাভাবিক থাকলে অনেক সময় আলাদা করে বিস্তারিত কিছু বলা হয় না।
রক্ত পরীক্ষা করানোর পর এক সপ্তাহ পার হয়ে গেল। জিপি থেকে কোনো খবর এলো না। স্বাভাবিকভাবেই ধরে নিতে পারতাম—সব ঠিক আছে। কিন্তু কেন যেন আমি পুরোপুরি আশ্বস্ত হতে পারছিলাম না। নিজের শরীর সম্পর্কে আমার মনে হচ্ছিল, আরও কিছু বিষয় পরীক্ষা করা দরকার। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম, নিজের খরচে বেসরকারিভাবে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাব।
স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য খরচ করলাম ১৫০ পাউণ্ড। এরপর বিস্তারিত রক্ত পরীক্ষার জন্য আরও ১২০ পাউণ্ড। অর্থাৎ শুধু নিজের স্বাস্থ্য সম্পর্কে একটু নিশ্চিত হওয়ার জন্য আমাকে পকেট থেকে দিতে হলো মোট ২৭০ পাউণ্ড ।
বেসরকারি চিকিৎসক পরীক্ষার পর আমাকে তিন পৃষ্ঠার একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন দিলেন। রক্তের কোনো উপাদান কত আছে, কোনটি স্বাভাবিক সীমার মধ্যে, কোনটি সেই সীমার বাইরে—সবকিছু পরিষ্কারভাবে লেখা। প্রতিবেদনটি হাতে পাওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই আমার মনে প্রশ্ন দেখা দিলো। আমি জিপির কাছে জানতে চাইলাম, বেসরকারি রক্ত পরীক্ষার রিপোর্টে যে বিষয়গুলো উঠে এসেছে, সেগুলো আগের পরীক্ষায় আমাকে কেন জানানো হয়নি? তখন যে উত্তর পেলাম, তা আমাকে কিছুটা বিস্মিত করল। তারা বললেন—“আমরা পূর্ণাঙ্গ রক্ত পরীক্ষা করিনি।”
অবশ্য এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। এনএইচএসের চল্লিশোর্ধ্ব স্বাস্থ্য পরীক্ষা পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্য পরীক্ষা নয় । এর মূল লক্ষ্য নির্দিষ্ট কিছু রোগের ঝুঁকি যাচাই করা। এতে সাধারণত রক্তচাপ, কোলেস্টেরল এবং প্রয়োজন অনুযায়ী রক্তে শর্করার (চিনি) মাত্রা পরীক্ষা করা হয়। তাই একজন রোগী যেটিকে ‘সম্পূর্ণ রক্ত পরীক্ষা’ ভাবতে পারেন, এনএইচএস-এর নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা আসলে সেটি নয়।
কিন্তু রোগী হিসেবে আমার প্রশ্ন অন্য জায়গায়। আমি যদি নিজের টাকা খরচ করে বিস্তারিত পরীক্ষা না করাতাম, তাহলে যে বিষয়গুলো পরে গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করা হলো, সেগুলো কি তখন ধরা পড়ত?
আমার বেসরকারি পরীক্ষার প্রতিবেদন দেখার পর জিপি আবার রক্ত পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিল।পরীক্ষা হলো। কিছুদিন পর আমাকে জানানো হলো, ফলাফল এসেছে এবং একজন চিকিৎসকের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলা প্রয়োজন। স্বাভাবিকভাবেই তখন মনে হলো—হয়তো এমন কিছু পাওয়া গেছে, যা নিয়ে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা দরকার। ভাবলাম, ভালো কথা। এবার অন্তত বিষয়টি পরিষ্কার হবে। কিন্তু চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলার জন্য যে সময় দেওয়া হলো, সেটিই ছিল আমার জন্য সবচেয়ে বড় বিস্ময়। প্রায় দুই মাস পরে! সরাসরি চিকিৎসকের সামনে বসে দেখা নয়—শুধু ফোনে কথা বলার জন্য এপোয়েন্টমেন্ট। তারপর দুই মাস অপেক্ষা করলাম।
গত সপ্তাহে সেই কাঙ্ক্ষিত ফোনালাপ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু জিপি থেকে আবার ফোন এলো। জানানো হলো, তারা খুব ব্যস্ত । তাই নির্ধারিত সময়টি আরও প্রায় এক মাস পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ প্রথম রক্ত পরীক্ষা করার পর চার মাসেরও বেশি সময় পার হয়ে গেছে, অথচ আমি এখনও নিশ্চিতভাবে জানি না আমার রক্ত পরীক্ষার চূড়ান্ত ফল কী এবং চিকিৎসকের মূল্যায়ন কী।
এরপর যদি ওষুধের প্রয়োজন হয়? যদি আরও পরীক্ষা দরকার হয়? যদি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে পাঠানো হয়? তাহলে আবার কতদিন অপেক্ষা করতে হবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আমার জানা নেই। সৌভাগ্যবশত, আমি নিজের অর্থ খরচ করে বেসরকারি পরীক্ষা করিয়েছিলাম। ফলে অন্তত নিজের স্বাস্থ্য সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পেয়েছি এবং কোন বিষয়গুলোতে নজর দেওয়া দরকার, সে সম্পর্কে সচেতন হতে পেরেছি। কিন্তু এখানেই আমার বড় প্রশ্নটি আসে। আমরা ব্রিটেনে এত ট্যাক্স দিই—তারপরও কেন এই অপেক্ষা?
এনএইচএস ব্রিটেনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি । লাখ লাখ মানুষ প্রতিদিন এর সেবা পাচ্ছেন। জরুরি চিকিৎসা থেকে শুরু করে জটিল অস্ত্রোপচার, ক্যানসারের চিকিৎসা, মাতৃত্বসেবা—অসংখ্য মানুষের জীবন রক্ষা করছে এই প্রতিষ্ঠান। এনএইচএস-এর চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য কর্মীদের পরিশ্রম নিয়েও প্রশ্ন নেই। অনেক ক্ষেত্রে তাঁরা প্রচণ্ড চাপের মধ্যে কাজ করছেন। কিন্তু একই সঙ্গে একজন সাধারণ ট্যাক্সদাতার অভিজ্ঞতাও উপেক্ষা করা যায় না।
২০২৬–২৭ অর্থবছরে এনএইচএস ইংল্যান্ডের রাজস্ব ব্যয়ের সর্বোচ্চ সীমা দুই শ’ পনেরো বিলিয়ন পাউন্ডেরও বেশি। অন্যদিকে একজন সাধারণ কর্মজীবী মানুষের কথাই ধরা যাক। ইংল্যান্ডে কারও বার্ষিক বেতন যদি ৩৯ হাজার পাউণ্ড হয়, তাহলে বর্তমান করহারে তাঁর আয় থেকে আয়কর ও ন্যাশনাল ইনস্যুরেন্স বাবদ বছরে প্রায় ৭৪০০ পাউণ্ড চলে যায়। এর পাশাপাশি ওই চাকরির জন্য নিয়োগকর্তাকেও প্রায় ৫১০০ পাউণ্ড ন্যাশনাল ইনস্যুরেন্স দিতে হয়।
অর্থাৎ ৩৯০০০ পাউন্ড বেতনের একটি চাকরিকে ঘিরে সরকার বছরে প্রায় ১২,৫০০ আয় আয়কর ও ন্যাশনাল ইনস্যুরেন্স পায় । অবশ্য নিয়োগকর্তার ন্যাশনাল ইনস্যুরেন্স কর্মীর নিজের বেতন থেকে কাটা হয় না; এটি নিয়োগকর্তার আলাদা ব্যয়।
এর বাইরে একজন মানুষ প্রতিদিন আরও কতভাবে ট্যাক্স দেন?
বাজারে পণ্য কিনলে মূল্য সংযোজন কর, গাড়ি চালালে বিভিন্ন কর ও শুল্ক, জ্বালানি কিনলে কর, বাড়ি থাকলে কাউন্সিল কর—প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে একজন নাগরিকের আয়ের বড় একটি অংশ রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় চলে যায়। আমরা কর দিই কারণ আমরা একটি কার্যকর রাষ্ট্রীয় সেবা প্রত্যাশা করি। কেউ অসুস্থ হলে সময়মতো চিকিৎসা পাবেন, পরীক্ষার ফল দ্রুত জানতে পারবেন, প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলতে পারবেন—এগুলো খুব বেশি প্রত্যাশা হওয়ার কথা নয়।
আমি এটাও বুঝি, এনএইচএস প্রচণ্ড চাপের মধ্যে আছে। রোগীর সংখ্যা বাড়ছে, জনসংখ্যার বয়স বাড়ছে, চিকিৎসার খরচ বাড়ছে এবং চিকিৎসক ও কর্মীদের ওপর কাজের চাপও অনেক। কিন্তু একজন রোগীর রক্ত পরীক্ষার ফল নিয়ে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলার জন্য যদি দুই মাস অপেক্ষা করতে হয়, এরপর সেই সময় আবার এক মাস পিছিয়ে যায়—তাহলে প্রশ্ন উঠবেই। সমস্যা কি অর্থের অভাব? নাকি চিকিৎসক ও কর্মীর অভাব? নাকি ব্যবস্থাপনায় সমস্যা? নাকি বিপুল অর্থ বরাদ্দ হলেও রোগীর কাছে সঠিক সময়ে সেবা পৌঁছানোর ব্যবস্থাটিতেই বড় ধরনের দুর্বলতা রয়েছে?
সবার তো বেসরকারি চিকিৎসার সামর্থ্য নেই আমার অভিজ্ঞতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্ভবত এটিই। আমি ২৭০ পাউণ্ড খরচ করে বেসরকারিভাবে পরীক্ষা করাতে পেরেছি। কিন্তু সবাই কি পারবেন? যিনি ন্যূনতম মজুরিতে কাজ করেন, যিনি সংসারের খরচ মেটাতে হিমশিম খান, যাঁর মাসের শেষে হাতে খুব সামান্য অর্থ থাকে—তিনি কী করবেন? তিনি হয়তো জিপির ফোনের অপেক্ষায় থাকবেন। এক মাস। দুই মাস। তিন মাস। হয়তো আরও বেশি । স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে এই অপেক্ষা কখনো কখনো শুধু বিরক্তিকর নয়; কোনো কোনো রোগের ক্ষেত্রে দেরি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তাই আমার প্রশ্ন এনএইচএসের চিকিৎসক বা নার্সদের বিরুদ্ধে নয় । বরং প্রশ্নটি পুরো ব্যবস্থার কাছে।বছরে শত শত বিলিয়ন পাউন্ড ব্যয় করার পরও একজন সাধারণ রোগী কেন সময়মতো নিজের পরীক্ষার ফল নিয়ে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলতে পারবেন না? কেন একজন মানুষকে নিজের স্বাস্থ্য সম্পর্কে নিশ্চিত হতে শত শত পাউন্ড খরচ করে বেসরকারি ব্যবস্থার দ্বারস্থ হতে হবে? এনএইচএস নিঃসন্দেহে ব্রিটেনের একটি অমূল্য প্রতিষ্ঠান। একে দুর্বল নয়, আরও শক্তিশালী করাই প্রয়োজন। কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠানকে ভালোবাসার অর্থ তার সমস্যাগুলো নিয়ে চুপ থাকা নয়। বরং প্রশ্ন করা দরকার—এত বিপুল অর্থ কোথায় যাচ্ছে, কীভাবে ব্যয় হচ্ছে এবং রোগী সেই অর্থের বিনিময়ে সময়মতো কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছেন কি না। কারণ শেষ পর্যন্ত অর্থটি আসে জনগণের কাছ থেকেই। আর তাই একজন সাধারণ করদাতা হিসেবে আমার প্রশ্ন খুবই সহজ—আমার করের টাকা যায় কোথায়?
মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান : ফাইন্যানশিয়াল এডভাইজর, লন্ডন । যুক্তরাজ্য।


