পরিবারের সংবাদ সম্মেলন : রয়্যাল লন্ডন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন গুরুতর অসুস্থ শিশু আয়েশার ভেন্টিলেশন বন্ধের সিদ্ধান্ত স্থগিতের আহ্বান
প্রকাশিত হয়েছে : ১৮ জুন ২০২৬
দেশ ডেস্ক, ১৮ জুন ২০২৬ : রয়্যাল লন্ডন হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যায় চিকিৎসাধীন গুরুতর অসুস্থ নবজাতক আয়েশা আলিয়া সিদ্দিক-এর জীবন রক্ষায় ভেন্টিলেশন বন্ধের মতো কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে আহবান জানিয়েছে পরিবার। একই সাথে স্বাধীন বিশেষজ্ঞের দ্বিতীয় মতামত বিবেচনারও আহ্বান জানিয়েছে তারা।
১৭ জুন বুধবার দুপুরে লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে শিশু বাবা আকবর বিন সিদ্দিক বলেন, আমরা অলৌকিক কিছু চাই না। আমরা শুধু চাই, আমাদের মেয়ের জীবন নিয়ে কোনো চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সম্ভাব্য সব পথ খতিয়ে দেখা হোক।”
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন আয়েশার মা মরিয়ম আক্তার রুবিনা, পরিবারের আইনি সহায়তাকারী সলিসিটর অ্যাডভোকেট ইমতিয়াজ হোসেন এবং শিশুর নানা আবুল হোসাইন মানিক।
সংবাদ সম্মেলনে শিশুর পিতা আকবর বিন সিদ্দিক জানান, তার স্ত্রী নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রসবপূর্ব যাবতীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করেন । ২২ এপ্রিল ৩৬ সপ্তাহের নিয়মিত স্ক্যান এবং ২৪ এপ্রিল চিকিৎসকদের সঙ্গে সাক্ষাতে শিশুর সুস্থতা নিয়ে তাদের কোনো গুরুতর উদ্বেগের কথা জানানো হয়নি। পয়লা মে প্রসবের তারিখ নির্ধারণ করা হলেও পরে তা ৫ মে নির্ধারণ করা হয়।
২৭ এপ্রিল সকালে গর্ভের শিশুর নড়াচড়া কম অনুভব করলে মরিয়ম আক্তার রুবিনা রয়্যাল লন্ডন হাসপাতালে যান । সেখানে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করলেও নির্ধারিত সময়ে চিকিৎসক তাকে দেখেননি । পরে এক ধাত্রী (মিডওয়াইফ) তাকে আশ্বস্ত করেন যে, এটি প্রসবের প্রকৃত ব্যথা নয়। সেদিন শিশুর নড়াচড়া নিয়ে আর কোনো বিস্তারিত পরীক্ষা ছাড়াই রাত সাড়ে ১০টার দিকে তাকে বাসায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
এর দুই দিন পর ৩০ এপ্রিল আবারও শিশুর নড়াচড়া কম অনুভুত হলে তিনি হাসপাতালে যান । এবার পরীক্ষা করে চিকিৎসকেরা জানান, গর্ভের শিশুটি মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে এবং জরুরি সিজারিয়ান অপারেশন প্রয়োজন।
সেদিন সকাল পৌনে ১২টার দিকে আয়েশার জন্ম হয় । জন্মের পরপরই তার শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে তাকে ভেন্টিলেশনে নেওয়া হয় এবং নিবিড় পরিচর্যায় রাখা হয় । কিন্ত কয়েক ঘণ্টা পর চিকিৎসকেরা জানান, অক্সিজেনের অভাবে শিশুটি হাইপক্সিক-ইসকেমিক এনসেফালোপ্যাথি নামে পরিচিত গুরুতর মস্তিষ্কের আঘাতে আক্রান্ত হয়েছে । তারা আরও জানান, একটি পরীক্ষামূলক ওষুধ প্রয়োগের জন্য পরিবারের সম্মতি নেওয়া হলেও নির্ধারিত সময়সীমা পার হয়ে যাওয়ায় শেষ পর্যন্ত সেই ওষুধ আর দেওয়া সম্ভব হয়নি ।
পরবর্তীতে শিশু আয়েশাকে ৭২ ঘণ্টার ‘কুলিং থেরাপি’ দেওয়া হয় । ৫ মে করা এমআরআই পরীক্ষায় তার মস্তিষ্কের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অংশে গুরুতর ক্ষতির বিষয়টি নিশ্চিত হয়।
বর্তমানে আয়েশা নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন রয়েছে। সে এখনও ভেন্টিলেশনের ওপর নির্ভরশীল। কিছুদিন আগে একবার ভেন্টিলেশন খুলে তার স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাসের চেষ্টা করা হলেও প্রায় ১৫ মিনিট পর আবার ভেন্টিলেশনে দিতে হয়।
আয়শার বাবা বলেন, সে আমাদের কণ্ঠস্বর শুনে সাড়া দেয়। তার মা হাত ধরলে সে অনুভব করে। সে আমাদের মেয়ে। কিন্তু সম্প্রতি আমরা বুঝতে পারি, চিকিৎসকদের মধ্যে আয়েশার ভেন্টিলেশন প্রত্যাহার এবং ভবিষ্যতে জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসা সীমিত করার বিষয়ে আলোচনা চলছে। এ কারণে তিনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে চারটি বিষয় দাবি করেছেন।
দাবীগুলো হলো: সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আরও সময় দেওয়া, চিকিৎসা-সংক্রান্ত সব তথ্য স্বচ্ছভাবে জানানো, দেশি-বিদেশি স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের দ্বিতীয় মতামত নেওয়া ও সব বিকল্প বিবেচনা না হওয়া পর্যন্ত জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া।
তিন বলেন, চিকিৎসকদের দক্ষতা ও আন্তরিকতার প্রতি আমরা শ্রদ্ধাশীল । আমরা এনএইচএস এর সমালোচনা করতে চাই না। তবে মেয়ের জীবন নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে সব সম্ভাবনা বিবেচনার সুযোগ চাই।
তিনি বলেন, এই সংকটের শুরুতে তারা ইস্ট লন্ডন মসজিদের ইমাম ও খতীব শায়খ আবদুল কাইয়ুমের পরামর্শ নেন । পরে ডা. আবদুল মাজিদের মাধ্যমে তারা তাফিদা রাকিব ফাউন্ডেশন-এর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এরপর থেকে সংগঠনটি তাদের আইনি ও নৈতিক সহায়তা দিয়ে আসছে।
সংবাদ সম্মেলনের শেষ দিকে আবেগঘন বক্তব্যে আকবর বিন সিদ্দিক বলেন, ডাক্তারদের কাছে এটি একটি চিকিৎসা-সংক্রান্ত বিষয় হতে পারে, আইনজীবীদের কাছে একটি আইনি মামলা, সাংবাদিকদের কাছে একটি সংবাদ। কিন্তু আমাদের কাছে সে শুধু আমাদের মেয়ে।
তিনি আয়েশার জন্য সবার কাছে দোয়া কামনা করেন এবং বলেন, “আমরা শুধু চাই, আমাদের মেয়ের জীবন নিয়ে কোনো চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সম্ভাব্য সব চিকিৎসার সুযোগ নিশ্চিত করা হোক।

