কবি দবিরুল ইসলাম চৌধুরী ওবিই-এর ইন্তেকাল: ব্রিকলেন মসজিদে ঐতিহাসিক জানাজা, মানুষের ঢল
প্রকাশিত হয়েছে : ১৬ জানুয়ারি ২০২৬
ব্রিটেনে বাংলাদেশি কমিউনিটির প্রথিতযশা ব্যক্তিত্ব, মানবসেবায় নিবেদিতপ্রাণ সমাজকর্মী, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক এবং শিক্ষার আন্দোলনের অগ্রপথিক কবি দবিরুল ইসলাম চৌধুরী ওবিই হাজার হাজার মানুষের দোয়া, ভালোবাসা ও শ্রদ্ধায় সিক্ত হয়ে তিনি চিরবিদায় নিয়েছেন।
গত ১৪ জানুয়ারি মঙ্গলবার পূর্ব লন্ডনের ঐতিহ্যবাহী ব্রিকলেন মসজিদে মরহুমের জানাজা নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে নিউহ্যামের ফরেস্টগেইটের উডগ্রেইঞ্জ কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। জানাজায় যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন শহর ও অঞ্চল থেকে আগত হাজার হাজার মানুষ অংশগ্রহণ করেন, যা মরহুমের প্রতি মানুষের গভীর ভালোবাসা ও সম্মানের বহিঃপ্রকাশ।
জানাজার নামাজে ইমামতি করেন বিশিষ্ট আলেম মাওলানা সৈয়দ নাঈম আহমদ। এ সময় সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে মরহুমের সংগ্রামী, মানবিক ও দীনি জীবনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন ব্রিকলেন মসজিদের ইমাম মাওলানা মারুফ আহমদ এবং মাওলানা সৈয়দ নাঈম আহমদ। পরিবারের পক্ষ থেকে আবেগঘন বক্তব্য প্রদান করেন মরহুমের পুত্র আতিক চৌধুরী।
কবি দবিরুল ইসলাম চৌধুরী ছিলেন একজন স্বভাবজাত ও প্রখর প্রতিভাসম্পন্ন কবি। মানুষ, সমাজ কিংবা যে কোনো ঘটনা তাঁকে তাৎক্ষণিকভাবে কবিতায় অনুপ্রাণিত করত। শত শত কবিতা তাঁর মুখস্থ ছিল। ইংরেজি সাহিত্যে তাঁর গভীর দখল ছিল এবং তিনি শেক্সপিয়ারের কবিতাও অনর্গল আবৃত্তি করতে পারতেন। বাংলা ভাষায় তাঁর প্রকাশিত তিনটি কাব্যগ্রন্থ সাহিত্যাঙ্গনে বিশেষ মর্যাদা লাভ করেছে।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি যুক্তরাজ্যের সেন্ট অ্যালব্যান্স অ্যাকশন কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠন, সভা-সমাবেশ ও মিছিলে সক্রিয় অংশগ্রহণের পাশাপাশি হাজার হাজার পাউন্ড অর্থ সংগ্রহ করে মুক্তিযুদ্ধের তহবিলে জমা দেন।
১৯৫৭ সালে যুক্তরাজ্যে আগমনকারী এই মনীষী ব্যক্তি প্রবাসজীবনে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন নিরলসভাবে। বেনিফিট ফরম পূরণ, দোভাষী হিসেবে সহায়তা এবং সামাজিক পরামর্শ প্রদানের মাধ্যমে তিনি অসংখ্য মানুষের জীবন সহজ করেছেন। নিজ জন্মভূমি সুনামগঞ্জের দিরাই-শাল্লা অঞ্চলে তিনি ১৮টি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেন।
কোভিড-১৯ মহামারির সংকটকালেও তিনি মানবসেবায় অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। ব্যক্তিগত উদ্যোগে হাঁটা কর্মসূচির মাধ্যমে এবং পরবর্তীতে মিলিয়ন পাউন্ড সংগ্রহ করে তা বিভিন্ন দাতব্য খাতে দান করেন। ১০৬ বছর বয়সে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায়ও তিনি শয্যাশায়ী থেকেও ইবাদত ও দোয়ায় মগ্ন ছিলেন।
জমিদার পরিবারের সন্তান হওয়া সত্ত্বেও তাঁর জীবনে কোনো অহংকার ছিল না। তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী, পরহেজগার এবং নিয়মিত ইবাদতকারী। তাঁর জীবন ছিল মানবতা, সেবা ও নৈতিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
কবি দবিরুল ইসলাম চৌধুরী ওবিই-এর ইন্তেকালে ব্রিটেনসহ বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশি কমিউনিটিতে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। শোকাহত মানুষের কণ্ঠে একটাই দোয়া-মহান আল্লাহ যেন তাঁকে ক্ষমা করেন এবং পরকালে সর্বোচ্চ জান্নাত দান করেন।

