লন্ডনে কাকরদিয়া তেরাদল উচ্চ বিদ্যালয়ের ৪৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন
প্রকাশিত হয়েছে : ২৪ আগস্ট ২০২৬
দেশ ডেস্ক, ২৪ আগস্ট ২০২৬:: সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার কাকরদিয়া তেরাদল উচ্চ বিদ্যালয়ের ৪৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে লন্ডনে অনুষ্ঠিত হয়েছে এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠান। কাকরদিয়া তেরাদল আলিপুর এডুকেশন ট্রাস্ট ইউকের উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে শুধু গ্রামের বাসিন্দা ও শিক্ষার্থী মিলিয়ে ৫ শতাধিক মানুষ অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে ছিল প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের স্মৃতিচারণ, বিদ্যালয়ের উন্নয়নে সমন্বিত পরিকল্পনা এবং প্রিয় শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠাতাদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন। পাশাপাশি ব্রিটেনে বেড়ে ওঠা শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণে ছিল নানা সৃজনশীল আয়োজন। দুই পর্বে বিদ্যালয়, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নিয়ে নির্মিত একটি তথ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়।
যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষক, প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ের শিক্ষার্থী এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে পুনর্মিলনী উৎসবে যোগ দেওয়া প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের স্মারক সম্মাননা দেওয়া হয়। এছাড়া যুক্তরাজ্যে বসবাসরত নিজ গ্রামের নতুন প্রজন্মের কৃতি শিক্ষার্থীদেরও ট্রাস্টের পক্ষ থেকে সম্মাননা প্রদান করা হয়।
ট্রাস্টের সভাপতি নুরুল আমিন রাজুর সভাপতিত্বে এবং সহ-সভাপতি লোকমান হোসেন চৌধুরীর সার্বিক সহযোগিতায় অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সাধারণ সম্পাদক আব্দুল করিম খান। অনুষ্ঠানের বিভিন্ন পর্বে সহযোগিতা করেন সহ-সভাপতি আবু তাহের চৌধুরী, এডুকেশন সেক্রেটারি মো. আবু তাহের, জয়েন্ট ট্রেজারার অহিদুর রহমান চৌধুরী ও স্পোর্টস সেক্রেটারি মখলেসুর রহমান ছোটনসহ ট্রাস্টের অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন নুরুল হুসেন কাদির, ব্যারিস্টার মাসুদ চৌধুরী, রিয়াজ উদ্দিন কামাল, আহবাব আলম চৌধুরী, সাব্বির খান, রশিদ আহমেদ রাশেদ, সাইফুর রহমান, কাউন্সিলর ব্যারিস্টার আতিকুর রহমান, সুলতান মাহমুদ, ফয়জুল বারী, আবু সিনহা হীরণ, শহীদুজ্জামান, ব্যারিস্টার আব্দুল হাদী খান ও মনসুর খান প্রমুখ।
বক্তারা বিদ্যালয়ের গৌরবময় ইতিহাস, শিক্ষা বিস্তারে এর অবদান এবং প্রবাস থেকে বিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নয়নে সম্পৃক্ত থাকার গুরুত্ব তুলে ধরেন।
পুনর্মিলনীতে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা অংশ নেন বলে আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়।
বক্তারা বলেন, ১৯৮১ সালে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টি ৪৫ বছরে পা রেখেছে এবং এরই মধ্যে অর্জন করেছে অনেক সাফল্য। বিদ্যালয়ের হাজার হাজার শিক্ষার্থী বিভিন্ন পেশায় দেশে ও প্রবাসে আলোকিত কাজের মাধ্যমে সমাজে অবদান রাখছেন। সবার গর্বের সেই প্রিয় শিক্ষালয় কাকরদিয়া তেরাদল উচ্চ বিদ্যালয়। লন্ডনের এই অনুষ্ঠান তারই উজ্জ্বল উদাহরণ।
তারা আরও বলেন, পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানটি গতানুগতিক চিন্তা ও চর্চার গণ্ডি পেরিয়ে ব্রিটেনে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মকে বিভিন্ন সৃজনশীল আয়োজনের মাধ্যমে সম্পৃক্ত করেছে। বাবা-মায়ের বিদ্যালয়ের অনুষ্ঠানে সন্তানদের অংশগ্রহণ তাদের শিকড়ের সঙ্গে বন্ধনে আবদ্ধ করে, যার দূরপ্রসারী ইতিবাচক প্রভাব রয়েছে।
সভাপতি নুরুল আমিন রাজু স্বাগত বক্তব্যে বলেন, কাকরদিয়া-তেরাদল আলিপুর এডুকেশন ট্রাস্ট ইউকে প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য গোটা অঞ্চলে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়া। এই পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান তাদের ধারাবাহিক কাজের অংশ। যারা গ্রামে শিক্ষার আলো ছড়াতে উদ্যোগ নিয়েছেন, বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করেছেন এবং নানাভাবে সহযোগিতা করে বিদ্যালয়কে বর্তমান পর্যায়ে নিয়ে এসেছেন—তাদের সবাইকে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মান জানানোই ছিল এ আয়োজনের অন্যতম উদ্দেশ্য।
সহ-সভাপতি লোকমান চৌধুরী বলেন, ‘শিক্ষায় একসঙ্গে এগিয়ে যাই’—এই স্লোগানকে সামনে রেখে কাকরদিয়া তেরাদল আলিপুর এডুকেশন ট্রাস্ট ইউকে নিজ অঞ্চলের শিক্ষার উন্নয়নে সবার সহযোগিতা নিয়ে কাজ করছে। যুক্তরাজ্য প্রবাসীদের সহযোগিতায় আয়োজন করা হলেও বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের অংশগ্রহণ ও সহযোগিতার জন্য তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, সংগঠনের পক্ষ থেকে আনন্দের সঙ্গে ঘোষণা করা হচ্ছে—আগামী পাঁচ বছর পর বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বিশাল পরিসরে ৫০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হবে, ইনশাল্লাহ।
সন্ধ্যা ছয়টায় নতুন প্রজন্মের এডাম চৌধুরীর পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত এবং ইব্রাহীম চৌধুরীর ইংরেজি অনুবাদ পাঠের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হয়।
শিক্ষিকা সাজনা খানমের সার্বিক তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশি-ব্রিটিশ শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণে তিনটি ক্যাটাগরিতে সৃজনশীল অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। বিশেষ আকর্ষণ ছিল বিশিষ্ট ম্যাজিশিয়ান সায়মন পালমারের ম্যাজিক শো। ঘণ্টাব্যাপী পরিবেশনা ও গল্প বলার আয়োজনে শিশুদের অংশগ্রহণ সবাইকে মুগ্ধ করে। এছাড়া ছিল সাধারণ জ্ঞানের কুইজ প্রতিযোগিতা ও মিউজিক্যাল শো।
অনুষ্ঠানগুলো পরিচালনা করেন চারজন বাংলাদেশি-ব্রিটিশ শিক্ষক আনিশা আহমেদ, মাজেদুল ইসলাম, মারিয়া চৌধুরী ও নুরুন নেহার চৌধুরী।
নারীদের জন্য বিশেষ আয়োজন হেনা পেইন্টিংয়ের টিমলিডারের দায়িত্বে ছিলেন শিল্পী ইসরাহ চৌধুরী, আমীনা তুকী, নাসিহা আহমেদ, মারজানা আক্তার, তাহমিনা আক্তার তামান্না ও মারজানা বেগম ইমা।
ফেস পেইন্টিংয়ে টিমলিডারের দায়িত্ব পালন করেন আহমেদ চৌধুরী, সারাহ হোসেন চৌধুরী ও জান্নাহ ইয়াসমিন।
বিদ্যালয়ের স্মৃতি জাগিয়ে রাখতে আয়োজনে ছিল স্কুলের ছবিযুক্ত ফটোকার্ড কর্নার। লন্ডনের বুকে শিক্ষার্থীরা সেখানে ছবি তুলে প্রিয় বিদ্যালয়ের চিরচেনা ক্যাম্পাসের স্মৃতি খুঁজে নেন।
এছাড়া ছিল ওয়েলকাম সাইন, ফেস্টুন ও ইতিহাসবোর্ড। সবকিছুই সাজানো হয় শিকড়ভূমি এবং কাকরদিয়া তেরাদল উচ্চ বিদ্যালয়ের স্মৃতিচিহ্নকে ঘিরে।
বিভিন্ন পদের খাবারের ভেন্ডরদের কাছেও ছিল উপচে পড়া ভিড়। একই সঙ্গে ছিল সিলেটের চা এবং বাহারি পান-সুপারির আয়োজন। ট্রাস্টের পক্ষ থেকে সবার জন্য ছিল পার্সোনালাইজড বিস্কুট।
আতিথেয়তায়ও ছিল সৃজনশীলতার ছাপ। প্রতিটি টেবিলে আয়োজকদের পক্ষ থেকে ছিল ফেভার সুইটস, টেবিল পিকস, টি-কার্ডসহ নানা অনুষঙ্গ।
রাত ১১টা পর্যন্ত চলা অনুষ্ঠানটি বিগ স্ক্রিনে ৫ শতাধিক শুধু গ্রামের বাসিন্দা ও শিক্ষার্থী মুগ্ধতা নিয়ে উপভোগ করেন।
অনুষ্ঠানে কোনো ভুল-ত্রুটি হয়ে থাকলে তা ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার আহ্বান জানিয়ে এবং সব আনন্দ-উচ্ছ্বাস সম্মানিত অতিথিদের উদ্দেশে উৎসর্গ করে সহ-সভাপতি আবু তাহের চৌধুরী সবাইকে কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানান। এর মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি হয়।
‘শিক্ষায় একসঙ্গে এগিয়ে যাই’—এই স্লোগানকে সামনে রেখে ২০২৫ সালে যুক্তরাজ্যে কাকরদিয়া তেরাদল আলিপুর এডুকেশন ট্রাস্ট ইউকের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়।
সবার জন্য শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা, মানবিক সেবা ও উন্নয়নের লক্ষ্যে সিলেট জেলার বিয়ানীবাজার উপজেলার শেওলা ইউনিয়নের কাকরদিয়া-তেরাদল-আলিপুর গ্রামের যুক্তরাজ্যপ্রবাসীদের উদ্যোগে এই ট্রাস্ট কাজ করছে।
ট্রাস্টের অগ্রাধিকারমূলক উদ্যোগগুলোর মধ্যে রয়েছে দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি ও শিক্ষাসামগ্রী সরবরাহ, স্কুল, মাদ্রাসা ও মক্তবের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও সংস্কার, শিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মশালা এবং শিক্ষা-উন্নয়নমূলক কার্যক্রম বাস্তবায়ন।
পাশাপাশি গ্রন্থাগার, প্রযুক্তি কর্নার ও শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ তৈরি, বিজ্ঞানমেলা ও বিভিন্ন প্রতিযোগিতার আয়োজন, শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল কার্যক্রমে সহায়তা এবং নৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধ গঠনে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করাও ট্রাস্টের কার্যক্রমের অংশ। সংবাদ বিজ্ঞপ্তি

